Image description

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রূপকথার মতো ফিরে এলেন তিনি। চোটের ভয়াল থাবায় দীর্ঘ তিন বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর, ৩৪ বছর বয়সে নেইমার জুনিয়রকে রেখেই আসন্ন বিশ্বকাপের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করেছে ব্রাজিল। কোচ কার্লো আনচেলত্তির এই সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বে যেমন চমক সৃষ্টি করেছে, তেমনি ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে।

রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড।

নিজের অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে এক ভিডিও বার্তায় কান্নাভেজা চোখে নেইমার বলেন, ‘এই মুহূর্তে আবেগ ধরে রাখা সত্যিই কঠিন। বিগত দিনগুলোতে আমরা যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি, বিশেষ করে মানুষ আমাকে যেভাবে কষ্টের মুখোমুখি হতে দেখেছে—সেসব পেরিয়ে আজ এখানে পৌঁছানো এবং আরেকটি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পাওয়াটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমার চোখের এই জল স্রেফ খাঁটি আনন্দের।’

ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নেইমার আরও যোগ করেন, ‘আমাকে সমর্থন করার জন্য এবং আমার ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রতিটি ব্রাজিলিয়ানকে আমি মন থেকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমাদের সামনে লড়াই করার জন্য আরেকটি বিশ্বকাপ হাজির। আমরা ব্রাজিলে ট্রফি ফিরিয়ে আনার জন্য মাঠে নিজেদের জীবন বাজি রেখে খেলব, এটা নিশ্চিত।’

নেইমারের শারীরিক সক্ষমতা ও ফিটনেস নিয়ে শুরুতে অনেক বড় সংশয় থাকলেও, সান্তোসের হয়ে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার পেলেন এই ফরওয়ার্ড। আনচেলত্তি নিজেই জানিয়েছেন, আসন্ন বিশ্বকাপে নেইমার তাঁর দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছেন। এই ডাক পাওয়ার মধ্য দিয়ে ৩৪ বছর বয়সী এই মহাতারকার সামনে ক্যারিয়ারের বহুল প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফিটি ছোঁয়ার শেষ সুযোগ তৈরি হলো। তবে ব্রাজিলের শুরুর একাদশে জায়গা করে নেওয়াটা নেইমারের জন্য মোটেও সহজ হবে না; কারণ এই মুহূর্তে দলে তাঁর পজিশনে ম্যাথিউস কুনিয়া এবং লুকাস পাকেতা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

জাতীয় দলের হয়ে নেইমারের এই প্রত্যাবর্তন ঘটছে দীর্ঘ তিন বছর পর। ফলে সেলেসাওদের জার্সিতে তাঁর দীর্ঘদিনের গোলের খরা কাটানোর এটিই সবচেয়ে বড় মঞ্চ। 

রদ্রিগো এবং এস্তেভাওয়ের মতো তরুণ তারকাদের ইনজুরির কারণে নেইমারের অভিজ্ঞতা এখন ব্রাজিলের জন্য অপরিহার্য। মাঠের খেলার পাশাপাশি ড্রেসিংরুমে একজন অভিজ্ঞ 'লিডার' হিসেবে তাঁর উপস্থিতি দলকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করবে।

বিশ্বকাপকে সামনে রেখে রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কৌশল ইতিমধ্যেই অনেকটা স্পষ্ট। আক্রমণভাগের দুই উইংয়ে রাফিনিয়া এবং ভিনিসিয়াস জুনিয়রকে রেখে ছক কষছেন কোচ আনচেলত্তি। এরসঙ্গে মাঝমাঠে ‘অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার’ হিসেবে ম্যাথিউস কুনিয়ার নিয়মিত উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, কেমন হতে যাচ্ছে সেলেসাওদের মূল একাদশ। এমন এক সেটআপে নেইমারের ভূমিকা ঠিক কী হবে—তা নিয়ে যখন ফুটবলপাড়ায় তুমুল বিতর্ক, ঠিক তখনই আনচেলত্তি খোলসা করলেন তাঁর আসল পরিকল্পনা। ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড জানিয়েছেন, আসন্ন বিশ্বকাপে ৩৪ বছর বয়সী এই মহাতারকাকে ‘ইনসাইড ফরোয়ার্ড’ হিসেবে খেলানো হবে।

আল হিলালে থাকার সময় একের পর এক ইনজুরির ধাক্কায় নেইমারের খেলার ধরনে বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। গতি বা পেস দিয়ে এখন আর প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের পরাস্ত না করলেও, উইঙ্গার থেকে তিনি এখন পুরোদস্তুর একজন সৃষ্টিশীল অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারে রূপান্তরিত হয়েছেন। এখন তাঁর মূল শক্তি হলো নিখুঁত ড্রিবলিং, অসাধারণ ফুটবলীয় ভিশন এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণব্যূহ ভেঙে চুরমার করে দেওয়ার মতো ‘থ্রু পাস’ দেওয়ার ক্ষমতা। আর নেইমারের এই জাদুকরী সৃষ্টিশীলতা দলের সামগ্রিক খেলার ধার বাড়াতে ব্যবহার করতে চান আনচেলত্তি; যা ম্যাথিউস কুনিয়া কিংবা লুকাস পাকেতারা জাতীয় দলের জার্সিতে ধারাবাহিকভাবে করতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন। আনচেলত্তির এই নতুন ছক বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে কাঙ্ক্ষিত সোনালী ট্রফি এনে দিতে পারে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।