Image description

ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাদের প্রভাব শুধু গোল, ট্রফি কিংবা পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেদের সৃজনশীলতা, নৈপুণ্য ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে তারা হয়ে ওঠেন একটি প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমার জুনিয়র তেমনই একজন, যিনি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত নাম।

মাঠে তার অসাধারণ ড্রিবলিং, ক্ষিপ্র গতি ও আক্রমণাত্মক ফুটবল দর্শকদের মুগ্ধ করেছে বারবার। চোট, বিতর্ক কিংবা সমালোচনার মধ্যেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন তিনি। সেই ধারাবাহিকতায় ব্রাজিল জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেছেন এই তারকা ফুটবলার।

দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছিল কিংবদন্তি পেলের দখলে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৭৭ গোল করে বহু বছর ধরে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিলেন তিনি। তবে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে সেই রেকর্ড ভেঙে ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছেন নেইমার।

ব্রাজিলের মতো ফুটবল পরাশক্তির হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বিশাল অর্জন। কারণ দেশটির জার্সি গায়ে খেলেছেন পেলে, রোনালদো, রোমারিও, রিভালদো ও রোনালদিনহোর মতো অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার। তাদের ছাড়িয়ে শীর্ষে ওঠা নেইমারের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য।

শুধু গোলের রেকর্ডই নয়, ব্রাজিলকে প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক এনে দেওয়ার নায়কও ছিলেন নেইমার। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে তার নেতৃত্বেই ফুটবলে প্রথমবারের মতো স্বর্ণ জেতে ব্রাজিল। জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালে টাইব্রেকারে জয়সূচক শটটি নিয়েছিলেন তিনিই। একই আসরে সেমিফাইনালে হন্ডুরাসের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতেই গোল করে অলিম্পিক ফুটবলের দ্রুততম গোলগুলোর একটি করার কৃতিত্বও দেখান তিনি।

ক্লাব ফুটবলেও উজ্জ্বল নেইমারের ক্যারিয়ার। বার্সেলোনার হয়ে খেলাকালে লিওনেল মেসি ও লুইস সুয়ারেজকে নিয়ে গড়ে ওঠা বিখ্যাত ‘এমএসএন’ ত্রয়ী ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগ হিসেবে বিবেচিত। ২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনার ট্রেবল জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল নেইমারের। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকআউট পর্ব ও ফাইনালে তার গোল দলকে শিরোপা জয়ে বড় অবদান রাখে।

২০১৭ সালে ফুটবল বিশ্বকে নাড়িয়ে দেন নেইমার। রেকর্ড ২২২ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনা ছেড়ে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেইনে যোগ দেন তিনি। এটি এখনো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল দলবদল হিসেবে রয়ে গেছে।

মাঠের বাইরেও জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করছেন নেইমার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যা কয়েকশ মিলিয়নের বেশি। বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ও সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদদের একজন।

তার বিভিন্ন অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের একাধিক তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন নেইমার। সবচেয়ে ব্যয়বহুল ট্রান্সফার এবং অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কারণে বিশ্ব ফুটবলে তিনি একটি বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছেন।

তবে নেইমারের ক্যারিয়ারকে শুধু গোল কিংবা ট্রফির সংখ্যায় মূল্যায়ন করা কঠিন। তিনি এমন এক ফুটবলার, যিনি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্য, সৃজনশীলতা ও বিনোদনমূলক ধারা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তার ড্রিবল, ফ্লেয়ার ও সাহসী খেলার ধরন বিশ্বজুড়ে অসংখ্য তরুণকে ফুটবলের প্রেমে পড়তে অনুপ্রাণিত করেছে।

এরই প্রমাণ মিলেছে ২৫ জুন অনুষ্ঠিত ব্রাজিল-স্কটল্যান্ড ম্যাচে। দীর্ঘদিন পর জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে ফেরেন নেইমার। ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামতেই করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। প্রিয় তারকাকে আবারও সেলেসাওদের হয়ে খেলতে দেখে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা।

ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। শেষ বাঁশি বাজার পর চোখের জল মুছতে দেখা যায় তাকে। সেই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়—নেইমার কেবল একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি আবেগ, একটি প্রজন্মের স্মৃতি এবং আধুনিক ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় আইকন।