Image description

দেশজুড়ে তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ে যখন নাকাল মানুষ, তখন দেশের অন্যতম বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রামপালেই চলছে বারবার বন্ধ ও চালুর ঘটনা। যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লা সংকটে গত এক বছরে কেন্দ্রটির কোনো না কোনো ইউনিট অন্তত ৩০ বার বন্ধ হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বাগেরহাটের রামপালে অবস্থিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎকেন্দ্রের (বিআইএফপিসিএল) এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা। সম্প্রতি এক বৈঠকে বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামানাথ পূজারীর কাছে বারবার ইউনিট বন্ধ হওয়ার কারণ জানতে চান। এভাবে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চললে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটি

১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬৬০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রটির জন্য ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ১৬০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটি চালুর তিন বছরের মধ্যেই ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ায় বিদ্যুৎ বিভাগে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে কয়লা সংকটে তিনবার এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ২৭ বার কেন্দ্রটির কোনো না কোনো ইউনিট বন্ধ হয়েছে। কখনো বয়লার, কখনো জেনারেটর, আবার কখনো ড্রেইন লাইন লিকেজের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে।

২০২৫ সালের ১ জুলাই কয়লা সংকটে বন্ধ হয় ২ নম্বর ইউনিট। ৮ জুলাই সেটি চালু হলেও কয়েক দিনের ব্যবধানে আবার ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। জুলাইয়েই দুই ইউনিট একাধিকবার বন্ধ ও চালু করা হয়। আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে।

অক্টোবরে ২ নম্বর ইউনিট ড্রেইন লাইন লিকেজের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। ডিসেম্বরেও ১ নম্বর ইউনিট কয়েক দফা বন্ধ রাখতে হয়।

চলতি বছরেও কমেনি সমস্যা

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্তও রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে বন্ধের ঘটনা অব্যাহত থাকে। জানুয়ারিতে ২ নম্বর ইউনিট এবং পরে ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ফেব্রুয়ারি ও মার্চেও দুই ইউনিটে সমস্যা দেখা দেয়।

এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়। ৭ এপ্রিল জেনারেটর সমস্যায় ২ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়। ১২ এপ্রিল সেটি চালু হওয়ার পরদিনই বয়লার লিকেজের কারণে ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর মে ও জুনে বয়লার সমস্যায় দুই ইউনিটই একাধিকবার বন্ধ হয়েছে। ২৫ মে ১ নম্বর ইউনিট বন্ধ হওয়ার পর ২৯ মে চালু হয়। ১৬ জুন আবার সেটি বন্ধ হয়। ২০ জুন চালু হলেও দুই দিনের মাথায় ফের বয়লার সমস্যায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। ২৪ জুন চালু হওয়ার তিন দিনের মাথায় ২ নম্বর ইউনিটও একই সমস্যায় বন্ধ হয়।

জুলাইয়েও আবার বন্ধ হয় ২ নম্বর ইউনিট।

ক্ষোভ বিদ্যুৎ বিভাগের

রামপাল কেন্দ্র কেন বারবার বন্ধ হচ্ছে, তা দেখতে গত জুনে কেন্দ্রটি পরিদর্শন করেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

বিদ্যুৎ সচিবের সাম্প্রতিক বৈঠকেও কেন্দ্রটির উৎপাদন পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। কর্মকর্তারা মনে করছেন, দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রামপালের মতো বড় কেন্দ্র বারবার বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়।

তবে রামপাল কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে তারা রেকর্ড ৮ হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট।

উৎপাদন খরচ বেশি, দিতে হয় ক্যাপাসিটি চার্জ

রামপাল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে। কেন্দ্রটির প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ১৪ টাকার বেশি। বিপরীতে সরকার তা বিক্রি করে প্রায় ১১ টাকা দরে। ফলে প্রতি ইউনিটে ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে।

চুক্তি অনুযায়ী, কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও মাসিক ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকার সময়ও সরকারের ওপর আর্থিক চাপ অব্যাহত থাকে।

বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ মালিকানা

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা বাংলাদেশ ও ভারতের সমান। ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ৫০ শতাংশ করে মালিকানা রয়েছে।

কেন্দ্রটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও), হেড অব প্ল্যান্টসহ ১২ জন ভারতীয় কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি সিএফও ও জিএমসহ নয়জন ভারতীয় কর্মকর্তা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ভারতে চলে যান। পরে তাদের আর কাজে ফেরত নেওয়া হয়নি। এরপর এনটিপিসি নতুন কর্মকর্তাদের পাঠায়।

প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এবং বিদেশি ঋণের অর্থে পরিচালিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লা সংকটের স্থায়ী সমাধান এখন বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসএস