আল জাজিরার কলাম
মধ্যপ্রাচ্যে মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে চীন, কিন্তু কেন?
এক দশক পর মিসর সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে তার এই সফরকে চীন ও মিসরের অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদারের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মিসর চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে। একই সময়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কও বজায় রাখছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এই নীতিকে ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
চীনের জন্য মিসর মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবেশদ্বার। দেশটির বড় অর্থনীতি, সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ এবং আরব বিশ্ব ও আফ্রিকায় কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
কী নিয়ে আলোচনা
শির তিন দিনের সফরে আল-সিসির সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাত, সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা এবং মিসরে চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
দুই দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পরিবহন ও উৎপাদন খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চুক্তি সই করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সফরটি চীন-মিসরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭০ বছর পূর্তির সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে।
মিসরের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শি জিং পিং দুই দেশের ‘বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার পরিধি’ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে আল-সিসি মিসরে চীনা বিনিয়োগের প্রশংসা করেছেন এবং তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থানের প্রতি কায়রোর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বাড়ছে সামরিক সহযোগিতাও
চীন ও মিসরের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে সামরিক সহযোগিতা। আগস্টে দুই দেশ যৌথ বিমান মহড়া চালিয়েছে। এতে চীনের জে-১৬ যুদ্ধবিমান এবং মিসরের ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমান অংশ নেয়।
রাফালের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় চীনের জে-১৬ যুদ্ধবিমানের অংশ নেওয়া ছিল প্রথমবার।
মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা
শির মিসর সফর এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রভাবের পাশাপাশি চীনও নিজের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ রব গেইস্ট পিনফোল্ডের মতে, চীন এই পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। তার ভাষায়, চীন যুক্তরাষ্ট্রের ভারসাম্য হিসেবে এবং তুলনামূলকভাবে দায়িত্বশীল ও কম হস্তক্ষেপকারী আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছে।
মিসর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্য মিত্র এবং দেশটি প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পায়। তাই চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালেও কায়রো পুরোপুরি ওয়াশিংটনের দিক থেকে সরে যাচ্ছে—এমনটি মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।
বরং বিশেষজ্ঞদের মতে, মিসর বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চাইছে।
চীন-মিসর সম্পর্ক কতটা গভীর
২০১৪ সালে আল-সিসির চীন সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর হয়। ওই সময় দুই দেশ কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি চুক্তি সই করে।
বর্তমানে জ্বালানি তেল ছাড়া অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে চীন মিসরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মিসরে চীন ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে। এসব বিনিয়োগের মধ্যে কায়রোর পূর্বাঞ্চলে নতুন প্রশাসনিক রাজধানী এবং নীল নদের বদ্বীপে শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত বৈদ্যুতিক রেললাইন রয়েছে।
এ ছাড়া চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো কনটেইনার বন্দর, সবুজ হাইড্রোজেন, লোহার পাইপ, টায়ার ও স্যাটেলাইট খাতেও বিনিয়োগ করেছে।
চীনা বিনিয়োগের বড় অংশ সুয়েজ খাল এলাকা এবং আইন সোখনার চীন-মিসর টিইডিএ সহযোগিতা অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের অংশ। মিসরের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে প্রায় ২০০টি কোম্পানি রয়েছে এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
লেখক পরিচিতি
উসাইদ সিদ্দিকী আল জাজিরার একজন প্রতিবেদক। তিনি আল জাজিরার লাইভ নিউজ টিমের সদস্য এবং দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংবাদ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন করেন।
এই নিবন্ধটি সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা থেকে সংক্ষেপিত ও অনুবাদ করেছেন দৈনিক মানবকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক নুর আলম সিদ্দিকী।
প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশিত মতামত সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের প্রতিফলন। এগুলো দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদকীয় নীতি বা অবস্থানের সঙ্গে সর্বদা মিল নাও থাকতে পারে। প্রকাশিত লেখায় উপস্থাপিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর যথার্থতা ও মতামতের দায় লেখক ও মূল উৎসের। এ বিষয়ে দৈনিক মানবকণ্ঠ কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিরপেক্ষ।
এনএ




Comments