সাঁতারকুলের পর এবার উত্তরখানে এম এ কাইয়ুমের থাবা!
ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মহড়ায় দিশেহারা এলাকাবাসী
রাজধানীর বাড্ডা-সাঁতারকুল থেকে উত্তরখান বাউতার মৌজা—বিস্তীর্ণ এই জনপদে এখন আর পাখির ডাক নয়, বরং ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের হুঙ্কার আর সাধারণ মানুষের চাপা আর্তনাদই প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বদেশ প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এ কাইয়ুমের 'ভূমি লালসার' যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দিশেহারা এখন সহস্রাধিক পরিবার। কাঁটাতারের বেড়ায় অবরুদ্ধ সাঁতারকুলের পর এবার তার নজর পড়েছে উত্তরখানের অন্য কোম্পানির জমিতে; যেখানে কয়েকশ ভাড়াটে ক্যাডারের মহড়ায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বাড্ডা থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ ভাড়াটে সন্ত্রাসী এনে এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে জমি দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। উত্তরখানে এখনও কাঁটাতারের বেড়া দিতে না পারলেও, পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সাধারণ বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বদেশ প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এ কাইয়ুম গত ১৭ বছর ধরে মালয়েশিয়া থেকে আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াকিল উদ্দিনের সঙ্গে গোপন আতাত করে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। এই আঁতাতের বলে তিনি তৃণমূল বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বদেশ-সানভালী নামের আবাসন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এম এ কাইয়ুমের নিদের্শে সাতারকুল, বেরাইদ, ফকিরখালী পুরো এলাকা কাটা তারের বেড়া দিয়ে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয় তার ভাড়াটে সন্ত্রাসী বাহিনী ।
সরেজমিনে বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকায় কথা হয় ভুক্তভোগী বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের ছেলে শহিদুল হকের সাথে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বাবা অনেক কষ্ট করে আমার দুই বোনসহ আমাদের বসবাসের জন্য ১৯৭৮ সালে লোনের টাকায় ৩ কাঠা জমি কিনেছিলেন। আজ সেই জমিতে গেলে মারধর ও হুমকির শিকার হতে হয়।”
তিনি বলেন, “ স্বদেশ প্রপার্টিজের এমডি ড. এম এ কাইয়ুমকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই। বর্তমান সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। আমরা বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই ভূমিদস্যুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।”
আরেক ভুক্তভোগী নাসিরুল ইসলাম বলেন, “এম এ কাইয়ুমের নির্দেশে আমার ৮ কাঠাসহ অসংখ্য দরিদ্র মানুষের জমি দখল করে রাখা হয়েছে। আমরা মানববন্ধনসহ প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি। প্রয়োজনে আরও বড় আন্দোলনে যাব। কাইয়ুমের শাস্তি ও বিএনপি থেকে বহিষ্কার চাই।”
আনোয়ার হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী জানান, তাদের ১০ কাঠা জমি ইতিমধ্যে বালু ফেলে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। রাজিব হোসেন নামে এক জমির মালিক হুমকি-ধামকিতে বিরক্ত হয়ে কোনোমতে জমি বিক্রি করে দিতে চান।
প্রতিবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ভুক্তভোগী খসরু বলেন, “ভূমি দখলকারী এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইতে প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
এদিকে স্বদেশ প্রপার্টিজের এমডি ড. এম এ কাইয়ুম বাড্ডা থেকে তিনশ থেকে চারশো ভাড়াটে সন্ত্রাসী নিয়ে এসে উত্তরখান ও বাউতার মৌজার অন্য একটি কোম্পানির জমি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, কাইয়ুমের নির্দেশে এই সন্ত্রাসী বাহিনী এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। তারা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অন্যের জমি দখলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বর্তমানে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সাধারণ বাসিন্দারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
নরসিংদীর বাসিন্দা ড. এম এ কাইয়ুম বাড্ডা এলাকায় লজিং মাস্টার হিসেবে জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াকিল উদ্দিনের সঙ্গে মিলে জমি দালালি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে আবাসন ব্যবসায় প্রবেশ করেন। ২০০৯ সাল থেকে খিলক্ষেত, বরুয়া, তলনা, ডেলনা, পাতিরা ও বাউতার এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে স্থানীয়দের জমি দখল করে ‘স্বদেশ প্রপার্টিজ’ নামে প্রকল্প গড়ে তোলেন। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট ও একাধিক হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সাল থেকেই সাঁতারকুলে ভূমি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল এম এ কাইয়ুম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কিছু অংশের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে সাতারকুল, বেরাইদ, ফকিরখালী পুরো এলাকা কাটা তারের বেড়া দিয়ে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়। এছাড়া ড্রেজার পাইপের মাধ্যমে অন্যের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমিতে বালি ফেলে অবৈধভাবে ভরাট করার চেষ্টা চলাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাসী হামলা, মিথ্যা মামলা দায়ের এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হতে হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি।
মেজর (অব.) মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম এমপি হওয়ার পর কাইয়ুম স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং ঢাকা-১১, ১৭ ও ১৮ আসনে আধিপত্য বিস্তার করেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ঋণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যদিও জয়লাভ করতে পারেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৮-১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকে ম্যানেজ করে কাইয়ুম জোরপূর্বক ভূমি দখল চালিয়ে আসছিলেন। ৫ আগস্টের পর তা শতগুণ বেড়ে যায়। এলাকায় তার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব সাম্প্রতিক নির্বাচনেও পড়েছে বলে মনে করেন অনেকে। ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন— দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি, অবৈধভাবে দখল করা জমি ফিরিয়ে দেওয়া এবং এম এ কাইয়ুমকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার। তারা বলছেন, তাকে বহিষ্কার না করলে দল হিসেবে বিএনপির ওপরও জনরোষ পড়তে পারে।
এম এ কাইয়ুমের বক্তব্য জানতে তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। কয়েকবার রিং হয়, কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।




Comments