Image description

দেশের অর্থনীতি এক অস্বস্তিকর সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো খাতের সমস্যা নয়; এটি শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। ক্রমবর্ধমান এই সংকট শুধু উৎপাদন ব্যাহত করছে না, বরং দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে যে অর্থনীতি গত এক দশকে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির গল্প লিখেছে, সেই ভিত্তিই আজ নড়বড়ে হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে রপ্তানি খাতের পরিস্থিতি। দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস তৈরি পোশাক শিল্প, যার ওপর নির্ভর করে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এবং বৃহৎ শিল্প অবকাঠামো, সেটি এখন গভীর অনিশ্চয়তায়। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো রপ্তানি অর্ডার সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। 

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা যেখানে সময়, মান ও খরচ- এই তিন বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে জ্বালানি সংকট সরাসরি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ইতোমধ্যে এর প্রভাব দৃশ্যমান। টানা কয়েক মাস ধরে রপ্তানি আয় কমছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। 

আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পাওয়ার আশঙ্কায় বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। ভারত, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ এই সুযোগকে কাজে লাগাতে প্রস্তুত। একবার বাজার হারালে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন- এ বাস্তবতা আমাদের মনে রাখতে হবে।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর বহুমাত্রিক প্রভাব। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবে জেনারেটর ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। তাদের পক্ষে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছে, কেউ কেউ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে- যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। শিল্পাঞ্চলগুলোর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-দেশের প্রধান শিল্পকেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত লোডশেডিং এখন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘণ্টাভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থায় কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানেই সরাসরি উৎপাদন ক্ষতি। এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে উদ্যোক্তাদের জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে উৎপাদন খরচ ৩০-৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। এতে লাভ কমে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ডিজেলের অনিয়মিত সরবরাহ এবং উচ্চমূল্য শিল্প উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে পণ্যের চূড়ান্ত মূল্য বেড়ে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। শুধু উৎপাদন নয়, পুরো সাপ্লাই চেইনই এর প্রভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন- সমাধান কী? প্রথমত, স্বল্পমেয়াদে শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে হবে, যাতে অপচয় ও অনিয়ম কমানো যায়।

এই সংকটকে শুধু একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে এটি আমাদের জ্বালানি খাতকে পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দিতে পারে। অন্যথায়, শিল্প উৎপাদন হ্রাস, রপ্তানি পতন, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সংকট- সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি হবে। দীর্ঘমেয়াদে, জ্বালানি খাতে বহুমুখীকরণ অপরিহার্য। 

নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এলএনজি আমদানির অবকাঠামো উন্নয়ন, এবং অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান- এসব ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর বিনিয়োগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়ানো এবং অপচয় কমানোও জরুরি।

নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে- এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকও। উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে, যা সামগ্রিকভাবে সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার সময়। দেরি হলে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। দেশের অর্থনীতি ও শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।