রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দেশের অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতসহ নানা বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনের মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
র্যাব-পুলিশ দিয়ে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব নয়: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাজারে পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে র্যাব বা পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (Cost of Doing Business) কমানো অত্যন্ত জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য ও জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।
বেতন বাড়লে কমবে দুর্নীতি: সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ১১ বছর ধরে জাতীয় পে-স্কেল সমন্বয় করা হয়নি। মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে। মানুষের অভাব থাকলে দুর্নীতির প্রবণতা বাড়ে—এটি বাস্তব সত্য। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা দ্রুত সমন্বয় করা হলে এবং তাদের বৈধ আয় বাড়লে মাঠপর্যায়ে ও দাপ্তরিক দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে।
অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে ৪-৫ বছর লাগবে: দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি কঠিন রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে। আগামী অন্তত দুই বছর সরকারকে কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
পূর্বাচলে ক্রিয়েটিভ সেন্টার: অনুৎপাদনশীল মেগা প্রকল্পের বদলে কর্মসংস্থান ও পর্যটনমুখী প্রকল্পে জোর দিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ঢাকার অদূরে পূর্বাচলে ১৬০ একর জায়গাজুড়ে একটি বিশ্বমানের সমন্বিত ক্রিয়েটিভ সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই 'ক্রিয়েটিভ ইকোনমি'র প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে।
কালো টাকা রোধে ডিজিটাল সার্ভে: জমির সরকারি বা মৌজা রেট এবং প্রকৃত বাজারমূল্যের পার্থক্যের সুযোগ নিয়ে কালো টাকা তৈরি হচ্ছে। এটি বন্ধ করতে দেশজুড়ে ডিজিটাল সার্ভে করার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানান, আবাসন খাতে কর ফাঁকিদাতাদের চিহ্নিত করে জরিমানা করা হবে। তবে সাময়িকভাবে ২০ শতাংশ অতিরিক্ত জরিমানা কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ বাজেটে রাখা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাত ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ৫টি ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে জানান, এই ব্যাংকগুলো নিয়ে ছড়ানো গুজব ভিত্তিহীন। বিগত সরকারের আমলে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি টাস্কফোর্স’ গঠন করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিদেশে পাচারকারীদের সম্পদ জব্দের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া, লেনদেন ক্যাশলেস করতে ১ জুলাই থেকে ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হবে।
গভর্নরের ঋণখেলাপির অভিযোগ খণ্ডন: সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর নিজের বিরুদ্ধে ওঠা 'ঋণখেলাপি' হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন। তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠান 'হেরা সোয়েটার্স' একটি পরিবেশবান্ধব কারখানা এবং এর কার্যক্রম কখনোই বন্ধ হয়নি। কোভিডের কারণে ঋণ পরিশোধে কিছুটা বিলম্ব হলেও পরে আইন অনুযায়ী ডাউন পেমেন্ট দিয়ে তা পুনঃতফসিল করা হয়েছে এবং নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হচ্ছে। তাই আইনগতভাবে তিনি কোনোভাবেই ঋণখেলাপি নন।
অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদারের সঞ্চালনায় এই সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মানবকণ্ঠ/আরআই




Comments