বারবার একই জেলায় পদায়নের অভিযোগ বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে
বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একই জেলায় বারবার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের অভিযোগ উঠেছে আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে। বর্তমানে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি একই জেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড এবং রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নীতিমালা বহির্ভূত এই পদায়ন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে জেলার সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনিক মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
২০১৫ ও ২০২২ সালের বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়ন নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তাকে একই জেলায় একাধিকবার পদায়ন করা যাবে না। বিশেষ করে, যে জেলায় কেউ সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত ছিলেন, পরবর্তীতে সেই জেলায় ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন অফিসার বা আরডিসি হিসেবে পদায়ন করা যাবে না।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আনিসুর রহমান ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জে এডিসি হিসেবে যোগ দেন এবং ১১ মাস ধরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০২০ সালের শেষ দিকে তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলায় এসিল্যান্ড হিসেবে প্রায় দেড় বছর এবং ২০২২ সালে একই জেলায় আরডিসি হিসেবে ৭-৮ মাস দায়িত্ব পালন করেছেন। সব মিলিয়ে একই জেলায় তার কর্মকাল প্রায় তিন বছর।
দীর্ঘদিন একই জেলায় থাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সদর এসিল্যান্ড থাকাকালীন নামজারি, মিসকেস ও বিভিন্ন তদন্তে তিনি সাধারণ মানুষকে হয়রানি করেছেন এবং ইউনিয়ন তহসিল অফিস থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কাজ করেছেন। এমনকি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার পরিচিতির কারণে পক্ষপাতিত্বমূলক সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে গত ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগের অনুলিপি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় কমিশনারকেও পাঠানো হয়েছে, তবে ১৭ দিন অতিবাহিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কেবল চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয়, বগুড়া ও নওগাঁ জেলাতেও পদায়ন নীতিমালা লঙ্ঘনের চিত্র দেখা গেছে। বগুড়ায় ৩৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন, ৩০তম ব্যাচের নিলুফা ইয়াসমিন, ৩৬তম ব্যাচের আব্দুল ওয়াজেদ এবং ৩৭তম ব্যাচের মুনিরা সুলতানাসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা একই জেলায় বারবার বা দীর্ঘ সময় পদায়িত রয়েছেন। নওগাঁর রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিবুল হাসনের ক্ষেত্রেও একই জেলাতে আগে আরডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "পোস্টিং করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তারা কেন আমাকে একই জেলায় একাধিকবার রাখছে তা আমার জানা নেই।"
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ জানান, সরকার চাইলে একই জেলায় পদায়ন করতে পারে এবং এতে আইনি বাধা নেই বলে তিনি দাবি করেন। তবে পদায়ন সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট পরিপত্রের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (মাঠ প্রশাসন) রাহিমা আক্তার নীতিমালার বিষয়টি প্রথমে এড়িয়ে গেলেও পরে জানান, "এসিল্যান্ড হিসেবে থাকলে এডিসি হিসেবে যেতে পারবেন। তবে ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন অফিসার বা আরডিসি হিসেবে পদায়নের বিধিনিষেধের বিষয়টি নীতিমালা দেখে জানাতে হবে।"
নীতিমালা স্পষ্ট থাকলেও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এমন দ্বিমুখী বক্তব্য এবং কোনো ব্যবস্থা না নেওয়াকে রহস্যজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই জেলায় দীর্ঘ অবস্থান মাঠ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments