জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) দ্বিতীয় ক্যাম্পাস–সংক্রান্ত তিন দফা দাবিতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে জকসু, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্রফ্রন্ট ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শাখা ছাত্রদলের সংঘর্ষ হয়েছে। এ সংঘর্ষ ক্যাম্পাস থেকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পর্যন্ত গড়িয়েছে। হামলার জন্য একে অন্যকে দায়ী করেছে উভয় পক্ষ।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। আহতদের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও কয়েক দফা উত্তেজনা ও সংঘর্ষের অভিযোগ ওঠে। পরে গুরুতর আহত কয়েকজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার মকবুল হোসেন দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, বিকাল ছয়টা পর্যন্ত ৭০ জনের বেশি চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনো অনেকেই আসছেন চিকিৎসা নিতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে স্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং চিকিৎসাসেবার উন্নয়ন— এই তিন দাবিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী প্ল্যাকার্ড হাতে অডিটোরিয়ামের বাইরে অবস্থান নেন। পরে তারা অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করলে প্রক্টরিয়াল টিম বাধা দেয়। এ সময় সেখানে থাকা শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, জকসুর স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক নূর মোহাম্মদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং তার হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড ছিঁড়ে ফেলা হয়। পরে শহীদ মিনার এলাকাতেও উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহিন মিয়া, ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসিভসহ অনেক শিক্ষার্থী আহত হন।
আহতদের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, হাসপাতালেও তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় পার্শ্ববর্তী কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের বিভিন্ন প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ অব্যহত আছে।
জকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা অভিযোগ করেন, ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে তিন দফা দাবি শান্তিপূর্ণভাবে তুলে ধরতেই তারা প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেলের নেতৃত্বে প্রথমে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ করা হয়, পরে পোস্টার ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ধারাবাহিকভাবে হামলা চালানো হয়।
জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন, স্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং চিকিৎসাসেবা উন্নয়নের দাবিতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। তার দাবি, হামলায় ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৫ থেকে ২০ জনের অবস্থা গুরুতর। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পরও হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
রিয়াজুল ইসলাম আরও অভিযোগ করেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ সেনাবাহিনীর হাতে গেলে টেন্ডার–সংশ্লিষ্ট স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে- এ কারণেই আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন বলেন, একটি রাজনৈতিক সংগঠন গত ছয় মাসে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কোনো উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেনি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রদল এবং সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট নিরসনে দৃশ্যমান হল নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের পাশাপাশি জকসুর নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও সার্টিফিকেট আপলোডসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক সেবা সহজ করতে কাজ করছেন। কিন্তু একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে এসব কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং প্রশাসনকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা করছে।
শামসুল আরেফিনের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আইটি অবকাঠামো উন্নয়ন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু একটি গোষ্ঠী নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে দেশজুড়ে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তার ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ড অতীতে ফ্যাসিবাদী সরকারের অনুসারীদের কৌশলের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যারা বিভিন্ন ইস্যু তৈরি করে মানুষের দৃষ্টি প্রকৃত সমস্যা ও উন্নয়ন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতো।
এদিকে পুরো ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইস উদ্দীন বলেন, আমাদের কতিপয় শিক্ষার্থী প্লাকার্ড নিয়ে অডিটোরিয়ামে ঢোকার চেষ্টা করেছিলো। আমাদের প্রক্টোরিয়াল টিম ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে যারা ছিলো তারা নিষেধ করেছে। পরবর্তী সময়ে একটি ছাত্র সংগঠন এসে সেখানে প্রক্টরিয়াল বডির সঙ্গে বাধাদানে জড়িয়ে গেছে।
দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীকে দেওয়ার দাবির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ২য় ক্যাম্পাসের কাজ হবে কি হবে না, সেই দাবি কি আজকে জানানোর দরকার ছিলো? ১ম ফেইজের কাজের মেয়াদই এখনো ৪ মাস বাকি আছে। এই সিদ্ধান্ত (২য় ক্যাম্পাসের ২য় ফেইজের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত) কি ইউজিসির চেয়ারম্যান এককভাবে নিতে পারবেন? সেখানে এই দাবি নিয়ে যাওয়ার কারণ বুঝলাম না।
মানবকন্ঠ/এমআর




Comments