সুইসাইড নোট লিখে জাবি শিক্ষার্থী নিখোঁজ
অভিযোগের মুখে থাকা শিক্ষক তদন্ত কমিটিতে
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী কাজী মোহাইমিনুল ইসলাম শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সুইসাইড নোট লিখে নিখোঁজ হয়েছেন। এ ঘটনায় তাঁর লেখা নোট ও বিভাগের শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত অভিযোগে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. হুসাইন মো. সায়েমের নাম উঠে এসেছে। ঘটনাটি তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। তবে অভিযোগের মুখে থাকা ওই শিক্ষককেই কমিটির সদস্য করায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে গাণিতিক ও পদার্থবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাহবুব কবিরকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সহকারী প্রক্টর আল আমিন এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন প্রক্টর অফিসের ডেপুটি রেজিস্ট্রার সোহেল রানা। আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
নিখোঁজ শিক্ষার্থীর এক সহপাঠী জানান, মোহাইমিনুল দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ বিষয়ে বিভাগের বর্তমান সভাপতি অধ্যাপক ড. হুসাইন মো. সায়েম তাঁকে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে আবেদনপ্রক্রিয়ায় নানা জটিলতার কারণে তাঁকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
ওই সহপাঠী আরও বলেন, প্রথমবার রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করার পর সেটি হারিয়ে যায়। পরে তাঁকে নতুন করে আবেদন করতে হয় এবং নিজে গিয়ে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়। সব প্রক্রিয়া শেষে গত সপ্তাহে রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে বিশেষ পরীক্ষা নেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষরও ওই অনুমোদনপত্রে ছিল।
তবে গত শনিবার (১০ অক্টোবর) বিভাগের সভাপতি তাঁদের জানান, সামনে ছুটি থাকায় নতুন করে পরীক্ষা আয়োজনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগবে। ফলে আপাতত বিশেষ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়; তাঁকে পরবর্তী ব্যাচের সঙ্গে পরীক্ষা দিতে হতে পারে। এতে চলমান মাস্টার্স পরীক্ষায় মোহাইমিনুলের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে বলে জানান তাঁর সহপাঠী।
তিনি বলেন, মোহাইমিনুল পুরো বছর সহপাঠীদের সঙ্গে মাস্টার্সের কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। পরীক্ষার ঠিক আগে বিশেষ পরীক্ষা দিতে না পারার বিষয়টি জানার পর তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে দুপুরে একটি সুইসাইড নোট লিখে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। এরপর থেকে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন সহপাঠীরা।
মোহাইমিনুলের লেখা নোটে তিনি নিজের হতাশার কথা তুলে ধরে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। নোটে তিনি লেখেন, “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আমার হাতে অন্য কোনো অপশন নাই শুধু মৃত্য ছাড়া। কারণ তারা আমাকে এই দিকে ঠেলে দিয়েছে।”
নোটে শিক্ষকদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি নিজের ঋণ এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওনা অর্থের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করে সহপাঠীদের উদ্দেশে কিছু নির্দেশনাও লিখেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে আট দফা দাবি জানিয়ে বিভাগের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দেওয়া নোটিশে বলা হয়, নিখোঁজ হওয়ার আগে মোহাইমিনুলের লেখা নোটে শিক্ষকদের অবহেলার বিষয় উঠে এসেছে বলে তাঁরা মনে করছেন। তাঁর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—দ্রুত মোহাইমিনুলকে খুঁজে বের করা, ঘটনার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং ঘটনার দিন শিক্ষকদের দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. হুসাইন মো. সায়েম ও শিক্ষার্থী কল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক আবু সাদাত মো. সায়েমের পদত্যাগ, জিএস-৪০৪ কোর্সে মোহাইমিনুলের উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়ন এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের মূল্যায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে হয়রানি ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ, দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ক্যাম্পাসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, কার্যকর ছাত্র সংসদ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেওয়া এবং শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “শিক্ষার্থীদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। ওই শিক্ষার্থীর পরীক্ষার বিষয়টি আমরা দেখব। আপাতত তাঁকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তদন্ত কমিটির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখব। যেভাবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্ভব, সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, গত ১১ অক্টোবর বিকেল ৩টা থেকে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী কাজী মোহাইমিনুল ইসলাম নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সুইসাইড নোট লিখে তিনি ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন বলে তাঁর সহপাঠীরা দাবি করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সহপাঠীরা তাঁকে খুঁজছেন। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এসএ




Comments