Image description

 

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ফুটবল বিশ্ব আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে—বিশ্বফুটবল কি ধীরে ধীরে ইউরোপের একচেটিয়া আধিপত্যে চলে যাচ্ছে?

পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রশ্ন পুরোপুরি অমূলক নয়। শেষ ছয়টি বিশ্বকাপের মধ্যে পাঁচটিতেই শিরোপা জিতেছে ইউরোপের দল—২০০৬ সালে ইতালি, ২০১০ সালে স্পেন, ২০১৪ সালে জার্মানি, ২০১৮ সালে ফ্রান্স এবং ২০২৬ সালে আবার স্পেন। এই ধারাবাহিকতায় একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক শিরোপা। ১৯৯৮ সালের পর থেকে অনুষ্ঠিত আটটি বিশ্বকাপের মধ্যে ছয়টিই গেছে ইউরোপে। ২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও ইউরোপীয় শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

কিন্তু বিষয়টি শুধু বিশ্বকাপের ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়। আজকের ফুটবলের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, খেলোয়াড় উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং প্রতিভা বিকাশ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ইউরোপ।

২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১,২৪৮ জন ফুটবলারের মধ্যে ৪৬৪ জনই খেলেছেন ইউরোপের পাঁচটি প্রধান লিগে—ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা, বুন্দেসলিগা, সিরি আ এবং লিগ ওয়ানে। অর্থাৎ বিশ্বকাপের মোট খেলোয়াড়ের প্রায় ৩৭ শতাংশ এসেছে এই পাঁচ লিগ থেকেই।

এখানেই শেষ নয়। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের আয় গত এক দশকে ১৩ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগের বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি ইউরোপকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে বিশ্বের প্রায় সব বড় প্রতিভাই শেষ পর্যন্ত ইউরোপে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ক্লাবগুলোর তালিকায়ও ইউরোপের একচ্ছত্র আধিপত্য। রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার সিটি, বার্সেলোনা, বায়ার্ন মিউনিখ, লিভারপুল, পিএসজি—সবাই ইউরোপের। চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এখন শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে।

অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দুই ঐতিহাসিক পরাশক্তি—আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল—এখনও প্রতিভা তৈরি করে, কিন্তু সেই প্রতিভা খুব অল্প বয়সেই ইউরোপে চলে যায়। ফলে দেশীয় লিগগুলো আর আগের মতো প্রতিযোগিতামূলক থাকে না। অর্থনৈতিক বৈষম্য এই ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা। লিওনেল মেসি ও নেইমারের মতো একটি প্রজন্মের অবসান ঘটতে চলেছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এই দুই তারকা শুধু আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল নয়, পুরো দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলকে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন। তাঁদের বিদায়ের পর সেই শূন্যতা পূরণ করা সহজ হবে না।

দুঃখজনকভাবে, দক্ষিণ আমেরিকার দুই পরাশক্তির সমর্থকদের একটি বড় অংশ এখন নিজেদের উন্নতির চেয়ে প্রতিপক্ষের ব্যর্থতায় বেশি আনন্দ খুঁজে পায়। আর্জেন্টিনা–ব্রাজিলের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবশ্যই ফুটবলের সৌন্দর্যের অংশ। কিন্তু যখন এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আত্মসমালোচনা ও উন্নয়নের পরিবর্তে কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিদ্বেষে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন লাভবান হয় অন্যরা।

এদিকে ইউরোপ থেমে নেই। তারা একের পর এক আধুনিক একাডেমি তৈরি করছে, ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করছে, খেলোয়াড়দের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং ক্লাব ব্যবস্থাপনাকে শিল্পে পরিণত করেছে। ফলাফলও মিলছে ধারাবাহিকভাবে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। ইউরোপের আধিপত্য মানেই এই নয় যে বিশ্বফুটবলের ভবিষ্যৎ একমুখী। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, ২০২৬ সালেও ফাইনাল খেলেছে। ব্রাজিল এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রতিভার উৎস। আফ্রিকা, এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার অনেক দলও দ্রুত উন্নতি করছে। ফলে বিশ্বফুটবল এখনও বহুমাত্রিক।

প্রশ্নটি তাই “ফুটবল কি ইউরোপের হয়ে গেছে?”—এটি নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, “বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলো কি ইউরোপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের ফুটবল কাঠামো আধুনিক করতে পারছে?”

ইতিহাস বলে, ফুটবলে আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়। একসময় দক্ষিণ আমেরিকা ছিল বিশ্বফুটবলের কেন্দ্র। পরে ইউরোপ সেই নেতৃত্ব নিয়েছে। ভবিষ্যতেও শক্তির ভারসাম্য বদলাতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন আবেগ দিয়ে নয়, বিনিয়োগ, পরিকল্পনা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল দর্শনের মাধ্যমেই সম্ভব।

বিশ্বফুটবলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ট্রফির সংখ্যা নয়, কে সবচেয়ে ভালোভাবে আগামী প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে পারে—সেই উত্তরই।

 

সৌরভ হাসান

নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক মানবকন্ঠ