অবশেষে একটি সমন্বিত জাতীয় কর্মকৌশলের আওতায় আনা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে। সন্ত্রাস দমন, নিরাপত্তা, সীমান্ত সুরক্ষা, উন্নয়ন এবং বিদ্যমান আইন ও চুক্তির বাস্তবায়নকে আর বিচ্ছিন্নভাবে দেখবে না সরকার। অতীতে এসব বিষয় বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল প্রকট। এখন সামগ্রিক বিষয়গুলোকে একটি জাতীয় কর্মকৌশলের আওতায় এনে সমন্বিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জটিলতা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীকে নেতৃত্বে রেখে জাতীয় কমিটি নীতিগত দিকনির্দেশনা দেবে। স্বরাষ্ট্রসচিবের নেতৃত্বাধীন নির্বাহী কমিটি এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নযোগ্য কর্মকৌশলে রূপ দেবে। অন্যদিকে, পরামর্শক কমিটি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, সমস্যা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ তুলে ধরবে। এর ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্বও আরও স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলোর সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও কার্যকর প্রশাসনের মাধ্যমে পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি এবং জনগণের আস্থা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, তিন কমিটির এই উদ্যোগকে শুধু নতুন প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করা যাবে না। কারণ, এটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও উন্নয়নমুখী পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কর্মকৌশলের সূচনা হতে পারে।
এর আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক জাতীয় কমিটি, স্বরাষ্ট্রসচিবকে সভাপতি করে নির্বাহী কমিটি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির চেয়ারম্যানকে সভাপতি করে পরামর্শক কমিটি গঠন করে। একই দিনে সরকারি গেজেটেও তিন কমিটি গঠনের বিষয়টি পৃথকভাবে প্রকাশ করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুমাত্রিক বাস্তবতায় নিরাপত্তা, ভূমি, উন্নয়ন, প্রশাসন, সামাজিক সম্প্রীতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন—সবকিছুই পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি বিষয়কে অন্যটি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখলে কাঙ্ক্ষিত সমাধানে পৌঁছানো কঠিন। তিন স্তরের এই কাঠামোর মাধ্যমে সরকার পাহাড়ের সমস্যাগুলোকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তিন কমিটিই প্রয়োজন অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা বা প্রয়োজনীয় ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সদস্য কিংবা সহায়তাদানকারী কর্মকর্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। জাতীয় ও নির্বাহী কমিটির সচিবালয়ের প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত সুবিধা দেবে ডিজিএফআই। তবে সভাপতির নির্দেশে পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্ধারিত মেয়াদে সচিবালয়ের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
পাহাড়ে নিরাপত্তাহীনতা বরাবরই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে ভূমি বিরোধ সামাজিক আস্থায় চাপ তৈরি করে এবং কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে। ফলে নিরাপত্তা, ভূমি কিংবা উন্নয়নকে পৃথকভাবে বিবেচনা করে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধান করা কঠিন। নতুন তিন কমিটির কাঠামো এই বাস্তবতাকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করেছে।
পাহাড়ে স্থিতিশীলতার অন্যতম পূর্বশর্ত জননিরাপত্তা। সন্ত্রাস, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, অপহরণ কিংবা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সংঘাত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু নিরাপত্তা সংস্থার দায়িত্ব নয়; এটি সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনারও অপরিহার্য অংশ। পাহাড়ে সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, কৃষি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে মানুষের নিরাপদ চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করা জরুরি।
নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নত করা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলোর একটি হলো ভূমি। মালিকানা, দখল, পুনর্বাসন ও দীর্ঘদিনের বিরোধের সঙ্গে মানুষের বসতি, জীবন-জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা জড়িয়ে রয়েছে। ভূমি বিরোধের সমাধান তাই শুধু একটি প্রশাসনিক নিষ্পত্তির বিষয় নয়।
এটি পাহাড়ে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা তৈরিরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নতুন কাঠামোয় ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার ফলে এসব জটিলতা বৃহত্তর নীতিনির্ধারণী পরিসরে আলোচনার সুযোগ পাবে। ভূমি প্রশ্নে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য সমাধান যত এগোবে, সামাজিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিও তত শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার সরাসরি সংযোগ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে এই সংযোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পরামর্শক কাঠামোয় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, আঞ্চলিক পরিষদ এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্ব থাকায় স্থানীয় অভিজ্ঞতা জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পাহাড়ের নীতি শুধু পাহাড় সম্পর্কে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নয়, পাহাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়েই প্রণয়ন করা প্রয়োজন। স্থানীয় অংশগ্রহণ কার্যকর হলে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি ও সম্ভাব্য প্রতিরোধ কমানোর সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারকদের ধারণাও আরও স্পষ্ট হতে পারে।
নতুন উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদ্যমান আইন, চুক্তির শর্ত এবং বিধি-বিধান পর্যালোচনার সুযোগ। সময়ের সঙ্গে প্রশাসনিক ও সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়। ফলে বিদ্যমান কাঠামোর কার্যকারিতা যাচাই করে প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার আনা রাষ্ট্র পরিচালনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে সাংবিধানিক কাঠামো, প্রচলিত আইন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা।
পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কোনো একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়। এর জন্য একই সঙ্গে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ, ভূমি বিরোধের ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি, উন্নয়নের সুফল বিস্তৃত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। সরকারের তিন কমিটির কাঠামো সেই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে একটি জাতীয় কর্মকৌশলের আওতায় এনে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিয়েছে।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সিদ্ধান্তকে দৃশ্যমান বাস্তবতায় রূপ দেওয়া। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রশাসনিক সমন্বয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণের ওপর। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো মোকাবিলায় একটি সুসংহত পথনকশা তৈরি হতে পারে। তখন নিরাপত্তা ও উন্নয়ন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে পাহাড়ে স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
লেখক:
এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা
অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম
ই-মেইল: mamunzi859@gmail.com




Comments