ভোরের কুয়াশা কাটতেই ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ভিড় করেন মানুষ। কেউ পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে, কেউ যাত্রী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন ফেরিঘাটে। সবার চোখ ফেরির দিকে, সবার মুখে একই প্রশ্ন-আজ কি ফেরি চলবে? কিন্তু বেশিরভাগ দিনই উত্তর আসে না।
চিলমারী–রৌমারী ফেরিঘাটে এই অপেক্ষার দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা। উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে-এমন প্রত্যাশা নিয়ে ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন করা হয়েছিল চিলমারী–রৌমারী ফেরি সার্ভিস। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় নৌরুট এখন দুর্ভোগ, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার প্রতীক। নাব্যতা সংকটের অজুহাতে গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রী, চালক, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
ফেরি বন্ধ থাকায় কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার মানুষ ও পণ্যবাহী যানবাহনকে বিকল্প পথে দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে সময় দ্বিগুণের বেশি লাগছে, বাড়ছে পরিবহন খরচ। কৃষিপণ্য পরিবহন, হাটবাজারের সরবরাহ এবং জরুরি যাতায়াতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে প্রতিনিয়ত।
সোনাহাট স্থলবন্দর থেকে ময়মনসিংহে পাথর পরিবহনকারী ট্রাকচালক জসিম উদ্দিন বলেন, “ফেরি বন্ধ থাকলে যমুনা সেতু দিয়ে ঘুরে যেতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। ক্ষতি শুধু চালকের না, পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
বিআইডব্লিউটিএ চিলমারী ঘাটের লিপিবদ্ধ তথ্য অনুযায়ী,২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ফেরি চালু হওয়ার পর ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০৪ দিনের মধ্যে চলেছে ৯৭ দিন। ২০২৪ সালে পুরো বছরে ফেরি চলেছে ২৪১ দিন। ২০২৫ সালে চলেছে মাত্র ৮০ দিন।
উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৮৩৮ দিনের মধ্যে ৪৩০ দিনই ফেরি বন্ধ ছিল। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সময় ধরে অচল থেকেছে এই ফেরি সার্ভিস। এতে একদিকে যাত্রী ও পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। লোকসানে পড়ছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)।
ব্রহ্মপুত্র নদের অতিরিক্ত সিলিটেশন, ডুবো চর এবং উজানের ভাঙনের কারণে দ্রুত নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। উজান থেকে নেমে আসা পলিতে চর জেগে ওঠে, আবার বর্ষা এলেই নদীর গতিপথ বদলে যায়। ফলে বারবার ড্রেজিং করেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
বিআইডব্লিউটিএ ড্রেজিং বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান মানবকন্ঠকে বলেন, “চিলমারী–রৌমারী ফেরিপথ প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, যা দেশের সবচেয়ে বড় ফেরিপথ। অতিরিক্ত সিলিটেশনের কারণে এখানে সারাবছর ড্রেজিং প্রয়োজন। কিন্তু স্থানীয়দের বাধার মুখে কয়েক মাস কাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে দুটি সরকারি ড্রেজার দিয়ে সীমিত পরিসরে খনন চলছে।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ভিন্ন। তাঁদের ভাষ্য, খননের কাজ মূলত লোক দেখানো, বাস্তব ফল নেই। বরং এ খাতে অর্থ লুটপাট হচ্ছে, স্থায়ী নাব্যতা ফিরছে না।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশনের চিলমারী ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) প্রফুল্ল চৌহান জানান, “নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ডুবো চর ও খনন বন্ধ থাকায় হকের চর এলাকায় ফেরি চলাচলের মুখ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুম ছাড়া ফেরি চালুর সম্ভাবনা নেই।”
তিনি আরও জানান, ফেরি বন্ধ থাকায় প্রতিমাসে বিআইডব্লিউটিসির প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। পাশাপাশি এই ঘাটের অন্তত ২০ জন স্টাফ দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অলস সময় পার করছেন।
একসময় যে ঘাট উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে অনিশ্চয়তার প্রতীকে। নদীর বুকে থমকে থাকা ফেরির সঙ্গে যেন থমকে আছে এখানকার মানুষের জীবনও-ফেরি আসার অপেক্ষা, আর কার্যকর ও টেকসই সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।




Comments