রাঙ্গামাটি জেলা শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের দুর্গম জনপদ কুতুকছড়ি মধ্যপাড়া। প্রখর রোদে ধানের ক্ষেতে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করছেন ৩৭ বছর বয়সী কালিন্দী রানী চাকমা। কেন এই হাড়ভাঙা খাটুনি? প্রশ্নের জবাবে মলিন হাসিতে তিনি বলেন, "জায়গাজমি নেই, ছয়জনের সংসার। কাজ না করলে খাব কী? কিন্তু সারা দিন জান দিয়ে কাজ করলেও মজুরি পাই মাত্র ৩৫০ টাকা। অথচ পুরুষরা আমাদের ডাবল (দ্বিগুণ) পায়। সবকিছুর যে দাম, এতে আর পোষায় না।"
যখন বিশ্বজুড়ে নারীর অধিকার ও সমতার স্লোগান গুঞ্জরিত হচ্ছে, তখন পাহাড়ের জুম চাষ থেকে শুরু করে আনারস বাগান কিংবা ধানের ক্ষেতে কালিন্দী রানীদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পাহাড়ি জনপদে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা—প্রকৃতির সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পরিবারের ঘানি টানতে পুরুষের সমান বা তার চেয়েও বেশি পরিশ্রম করেন এই নারী শ্রমিকরা। তবুও মজুরির বেলায় তারা চরম বৈষম্যের শিকার।
মধ্যপাড়ার আরেক শ্রমিক মিতা চাকমা (৩৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বাজারে সবকিছুর আগুন দাম। এই সামান্য টাকায় সন্তানদের পড়াশোনা আর সংসার চালানো দায়। কাজ তো আমরা কম করি না, তাহলে মজুরি কেন কম হবে?" একই কষ্টের কথা জানালেন নানিয়ারচরের আনারস বাগানের শ্রমিক সাগরিকা চাকমা (৩৫)। তিনি বলেন, "রোদে পুড়ি, বৃষ্টিতে ভিজি। জ্বর-কাশি নিয়েও কাজ করতে হয়। গরিব মানুষ আমরা, তাই কম মজুরি দিলেও মুখ বুঝে মেনে নিতে হয়।"
এই মজুরি বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল। রাঙ্গামাটির আইনজীবী ও নারী উন্নয়নকর্মী কক্সী তালুকদার বলেন, "পাহাড়ের প্রান্তিক নারীদের এই বঞ্চনা দূর করতে সরকারকে দ্রুত একটি কার্যকর ও বৈষম্যহীন মজুরি কাঠামো বাস্তবায়ন করতে হবে।"
তবে রাঙ্গামাটি জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অনুকা খীসা আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, "পাহাড়ের নারীদের স্বাবলম্বী ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য দূর করতে আমাদের নানামুখী সচেতনতামূলক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।"
উৎসবের আলো যখন বড় বড় শহরে সীমাবদ্ধ, তখন পাহাড়ের ঢালে কালিন্দী কিংবা মিতা চাকমাদের একটাই চাওয়া—কাজের স্বীকৃতিটুকু যেন অন্তত সমান হয়। তারা চান শ্রমের ন্যায্য মূল্য, যা দিয়ে তারা তাদের সন্তানদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারেন।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments