মাদক ও চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত
বিএসএফের গুলিতে নিহত ২, বাড়ছে ক্ষোভ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, কসবা ও বিজয়নগর উপজেলা এখন মাদক ও চোরাচালানের অন্যতম প্রধান ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। সীমান্ত দিয়ে দেদারসে আসছে গাঁজা, মদ, ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ ভারতীয় কাপড় ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য। এসব অপকর্ম করতে গিয়ে সম্প্রতি বিএসএফের গুলিতে কসবা সীমান্তে দুইজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় সীমান্তজুড়ে এখন শোক আর আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সম্প্রতি কসবা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে কলেজছাত্র মোরসালিন ও নবীর হোসেন নিহত হন। গত মঙ্গলবার নিহতদের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে কসবায় আসেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী। তিনি নিহতদের কবর জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “সীমান্ত হত্যা বন্ধে সরকার কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হলে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে লংমার্চ কর্মসূচি দেওয়া হবে।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, সীমান্ত দিয়ে এত বিপুল পরিমাণ মাদক কীভাবে প্রবেশ করে? তিনি এ সময় স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সন্ধ্যা নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে সিন্ডিকেট। মাদক কারবারিদের ‘লাইনম্যান’ মোবাইলে সংকেত দেয়—‘লাইন ক্লিয়ার’। এরপর ‘লেবার’ বা শ্রমিকরা কাঁটাতারের বেড়া কেটে বা কালভার্টের নিচ দিয়ে শূন্যরেখা পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। ওপার থেকে মালামাল নিয়ে ফেরার সময় প্রায়ই বিএসএফের বাধার মুখে পড়ে তারা। গত ৮ মে রাতে এভাবেই অবৈধ পণ্য আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারান মোরসালিন ও নবীর হোসেন। এ ঘটনায় আহত আরও বেশ কয়েকজন পুলিশের ভয়ে আত্মগোপনে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
নিহত নবীর হোসেনের মা জাহেরা বেগম ও মোরসালিনের বাবা হেবজু মিয়ার আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলো। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা তারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাঘববোয়াল মাদক কারবারিরা এলাকার দরিদ্র তরুণদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে তিন উপজেলার বেশ কিছু প্রভাবশালী কারবারির নাম উঠে এসেছে:
আখাউড়া: সেনারবাদী সীমান্তের কালো, ইদন, সোহাগ, জনি; বাউতলা সীমান্তের আলামিন খন্দকার, শফিকুল ইসলাম শুভা; জয়নগর ও ছয়ঘরিয়া সীমান্তের পিয়ারুন, রতন, শামীম; এবং রাজেন্দ্রপুরের সেলিম ও ফারুক।
কসবা: গোপীনাথপুর ও বায়েক এলাকার নাঈম, সিরাজ, জমির, মালু এবং ধজনগর গ্রামের সোর্স স্বপন, তোফাজ্জল, রিয়াজুলসহ আরও অনেকে।
বিজয়নগর: এই উপজেলাকে মাদকের সবচেয়ে নিরাপদ রুট বলা হয়। এখানকার অন্যতম কারবারি হলেন জুয়ারি মানিক, মিস্টু, কালু, মদিনা, নিলুফা, ফজলুর রহমান বজলু এবং সানি ভূঁইয়াসহ স্থানীয় বেশ কিছু জনপ্রতিনিধি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ্ মো. আব্দুর রউফ জানান, মাদক দমনে গ্রামভিত্তিক তালিকা করা হচ্ছে। শুধু বিজয়নগরের সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের একটি অংশেই ৬১টি মাদক স্পট পাওয়া গেছে, যা অত্যন্ত ভয়াবহ।
বিজিবি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সুলতানপুর ব্যাটালিয়ন (৬০ বিজিবি) চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৮৯ কোটি টাকার এবং সরাইল ব্যাটালিয়ন (২৫ বিজিবি) ৩৩ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাদক ও চোরাচালানি পণ্য জব্দ করেছে। ৬০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শরিফুল ইসলাম ও ২৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জাব্বার আহমেদ জানান, সীমান্ত নিরাপত্তা ও চোরাচালান বন্ধে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে।
সচেতন মহলের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই মরণঘাতী মাদকের বিস্তার ঠেকানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সীমান্ত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক আন্দোলন।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments