Image description

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী উপজেলা কসবায় শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া রোধে ব্যতিক্রমী ও বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ছামিউল ইসলাম। মাদক ও চোরাচালানের হাতছানি উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে তিনি প্রশাসনিক নজরদারির পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

ইউএনও মো. ছামিউল ইসলাম জানান, কসবার তিনটি ইউনিয়ন ভারতীয় সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানকার শিশুরা মাদক ও চোরাচালানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় থাকে। অনেক সময় দরিদ্র পরিবারগুলো সামান্য ‘কাঁচা টাকা’র লোভে সন্তানদের বিএসএফের গুলির মুখে ঠেলে দেয়। ফলে শিশুরা নিয়মিত স্কুল থেকে দূরে সরে গিয়ে একপর্যায়ে ঝরে পড়ে।

এই সংকট মোকাবিলায় ইউএনও কেবল নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। ঝরে পড়া রোধে তিনি গ্রহণ করেছেন বেশ কিছু উদ্ভাবনী উদ্যোগ:

১. অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা ও সহায়তা: যেসব দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে ছিল, তাদের মায়েদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া এনজিওর মাধ্যমে হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালনের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে যাতে পরিবারগুলো সন্তানদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে তাদের স্কুলে পাঠাতে পারে।

২. ডিজিটাল নজরদারি ও শিক্ষক উপস্থিতি: শিক্ষকদের স্কুলে উপস্থিতি শতভাগ নিশ্চিত করতে তিনি প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন। প্রতিদিন সকাল ৯টা ২০ মিনিটের মধ্যে প্রধান শিক্ষকদের হাজিরা খাতার ছবি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ছুটির সময় ইউএনও বা শিক্ষা অফিসার র‍্যান্ডমলি (এলোমেলোভাবে) ভিডিও কল দিয়ে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন।

৩. হোম ভিজিট ও গ্রুপ স্টাডি: শিক্ষার মান বাড়াতে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘হোম ভিজিট’ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। শিক্ষকরা ৮-১০ জন শিক্ষার্থীর একটি গ্রুপের দায়িত্ব নিয়ে তাদের বাড়িতে গিয়ে পড়া সংগ্রহ করছেন। কোনো শিক্ষার্থী পড়া না বুঝলে গ্রুপের অন্য মেধাবী শিক্ষার্থীরা তাকে বুঝিয়ে দেয়, যা শিক্ষক দ্বারা তদারকি করা হয়।

৪. অবকাঠামো উন্নয়ন ও সচেতনতা: স্কুলগামী রাস্তা মেরামত, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ এবং খেলার মাঠ সংস্কারের মাধ্যমে শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। নিয়মিত মা সমাবেশ ও অভিভাবক সমাবেশের মাধ্যমে মাদক ও বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

ইউএনও মো. ছামিউল ইসলাম বলেন, ‘সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিভাবকরা সচেতন হলে এবং মাদক বা চোরাচালানের প্রলোভন ত্যাগ করলে ঝরে পড়ার হার শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। আমরা মিড-ডে মিল ও সবার জন্য অভিন্ন স্কুল ড্রেস নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছি। শিশুশ্রম ও ইভটিজিং বন্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকবে।’

উপজেলা প্রশাসনের এই তদারকির ফলে কসবায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার যেমন বেড়েছে, তেমনি কমেছে ঝরে পড়ার হার। স্থানীয় সচেতন মহল ইউএনও’র এই শিক্ষা-বান্ধব কার্যক্রমকে স্বাগত জানিয়েছেন।

মানবকণ্ঠ/আরআই