Image description

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ১০ নম্বর সলিমপুর ইউনিয়নের ‘জঙ্গল সলিমপুর’ এখন আর কেবল একটি জনপদ নয়, বরং এটি পরিণত হয়েছে দেশের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের এক অভয়ারণ্যে। বরিশাল, বগুড়া, নোয়াখালী, হাতিয়া ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খুনি, ডাকাত এবং মাদক কারবারিরা এখানে এসে গড়ে তুলেছে এক দুর্ভেদ্য আস্তানা। প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রায় ৩,১০০ একর পাহাড়ি এলাকায় এই অপরাধী চক্র নিজস্ব শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছে।

খুন করে যেখানে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ মেলে
অনুসন্ধানে জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরের অভ্যন্তরে ‘আলীনগর’ নামের একটি এলাকাকে সন্ত্রাসীরা তাদের নিজস্ব সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। অপরাধ জগতে একটি কথা প্রচলিত আছে “খুন করে আলীনগর চলে যাও, তুমি নিরাপদ।” 
মূলত নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে আসা ইয়াসিন ও তার ভাই ফারুক এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক। তাদের অনুমতি ছাড়া এই এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশ যেমন কঠিন, তেমনি সাধারণ মানুষের কোনো অভিযোগ করার সুযোগও নেই।

৩০ হাজার কোটি টাকার ভূমি ও পাহাড় নিধন
জঙ্গল সলিমপুরের প্রায় ৩,১০০ একর জমির আনুমানিক বাজারমূল্য ৩০ হাজার কোটি টাকার উপরে। এই বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে চলছে পাহাড় কাটা ও প্লট বিক্রির রমরমা ব্যবসা। এসকেভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও অবৈধ আবাসন ব্যবসার অঢেল টাকা দিয়ে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে চলে এই অপরাধযজ্ঞ। মুক্তিযোদ্ধা বসতিনগর, আল মদিনা হাউজিং, ছিন্নমূল সমাজ উন্নয়ন সংস্থাসহ নানা নামে সরকারি খাস জমি দখল করে লিজ নেওয়ার পাঁয়তারা চলে এখানে।

১ বছরে ৪ খুন ও চরম অস্থিতিশীলতা
বিগত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপ। গত এক বছরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই এলাকায় অন্তত চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে:
১. ২ জানুয়ারি ২০২৫: মীর আরমান (ইউনিয়ন শ্রমিক দল সভাপতি) দলীয় কর্মীর হাতে খুন।
২. ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: মোহাম্মদ মাসুদকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে প্রকাশ্যে হত্যা।
৩. ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫: সিডিএ আবাসিক সংলগ্ন এলাকায় বৃদ্ধ আবুল কালাম খুন।
৪. ৪ অক্টোবর ২০২৪: দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কাল্লু (২৮) নামে একজন নিহত।

সর্বশেষ ৪ অক্টোবরের ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একুশে টেলিভিশনের দুই সাংবাদিক ইয়াসিন বাহিনীর বর্বরোচিত হামলার শিকার হন। সন্ত্রাসীরা তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর করে এবং মোবাইল ও মানিব্যাগ লুট করে নেয়।

দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির কারখানা
জঙ্গল সলিমপুর যে কতটা ভয়ানক, তার প্রমাণ মেলে গত ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনীর অভিযানে। দুর্গম পাহাড়ে একটি দেশীয় অস্ত্র তৈরির কারখানার সন্ধান পায় সেনাবাহিনী। সেখান থেকে ৬টি দেশীয় অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ কার্তুজ, চাইনিজ কুড়াল, ওয়াকিটকি এবং অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এটি প্রমাণ করে যে, এই সন্ত্রাসীরা কেবল ভূমিদস্যু নয়, বরং তারা সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতিতেও সক্ষম।

থমকে আছে মহাপরিকল্পনা
২০২১ সালে সরকার জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করে সেখানে স্পোর্টস কমপ্লেক্স, কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, মডেল মসজিদ ও ইকো-পার্কসহ একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। তৎকালীন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শনও করেছিলেন। কিন্তু পরিদর্শনের সময় ইয়াসিন বাহিনীর হামলায় ইউপি সদস্য আরিফ গুরুতর আহত হওয়ার পর এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় সেই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্তিমিত হয়ে পড়ে।

প্রশাসনের বক্তব্য
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, তারা যতবারই পাহাড় কাটা বন্ধ করতে গেছে, ততবারই হামলার শিকার হতে হয়েছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‍্যাবের সমন্বয়ে একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযান ছাড়া জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরকে এই ভয়ংকর অপরাধচক্রের হাত থেকে মুক্ত করা এবং পাহাড় রক্ষা করা অসম্ভব।

বর্তমানে আওয়ামী লীগ আমলের দখলদারদের জায়গায় নতুন নতুন গ্রুপ যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। সীতাকুণ্ডের স্থায়ী বাসিন্দাদের কাছে জঙ্গল সলিমপুর এখন এক আতঙ্কের নাম।