হাওরে মাছের সংকট
হুমকিতে জামালগঞ্জের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যজীবীদের জীবন
দেশের অন্যতম ‘মৎস্য ভান্ডার’ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র মাছের সংকট। নদী-নালা ও বিল ভরাট হওয়া, নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহার এবং ত্রুটিপূর্ণ ইজারা প্রথার কারণে বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। ফলে বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক মৎস্যজীবী।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, ৩৪০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলায় নদী, নালা ও ছোট-বড় বিল মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪২ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। অথচ একসময় এই অঞ্চলে শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০টি প্রজাতি বিলুপ্তির পথে।
স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মতে, মাছের সংকট ও বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পেছনে প্রধানত মানবসৃষ্ট কারণ দায়ী। পলি পড়ে জলাশয় ভরাট হওয়ার পাশাপাশি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী, রিং জাল ও কারেন্ট জালের ব্যবহার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। এছাড়া প্রজনন মৌসুমে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন, সেচ দিয়ে বিলের তলা শুকিয়ে মাছ শিকার এবং জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে হাওরের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হচ্ছে।
গোপালপুর গ্রামের মৎস্যজীবী জয়কিশোর দাস অভিযোগ করেন, "ইজারা প্রথার ত্রুটির কারণে প্রকৃত জেলেরা আজ কোণঠাসা। একশ্রেণির প্রভাবশালী অসাধু ব্যবসায়ী নামে-বেনামে মৎস্যজীবী সংগঠন তৈরি করে জলমহাল ইজারা নিচ্ছে। তারা বেশি মুনাফার আশায় বিলের তলা শুকিয়ে এবং বিষাক্ত ওষুধ ব্যবহার করে মাছের প্রজনন ধ্বংস করছে।"
বিষ্ণুপুর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি মনিলাল সরকার বলেন, "প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হচ্ছেন লভ্যাংশ থেকে। সরকারের উচিত অ-মৎস্যজীবীদের নামে জলমহাল ইজারা দেওয়া বন্ধ করা এবং জমিতে কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা।"
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফেরদৌস ইবনে রহিম জানান, পাহাড়ি ঢলে জলাশয় ভরাট ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারের কারণে উৎপাদন কমছে। তিনি বলেন, "আমরা কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারীর বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। তবে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন বাড়াতে ভরাট হওয়া জলাশয় খনন ও স্থায়ী অভয়াশ্রম স্থাপন করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।"
মৎস্য সম্পদ রক্ষায় বৈশাখ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং প্রকৃত জেলেদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অন্যথায় হাওরের এই অমূল্য সম্পদ অচিরেই হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments