ময়মনসিংহের ভালুকায় জীবিকার তাগিদে একসময় বিভিন্ন মসজিদ ও মাদরাসায় ইমামতি করতেন হাফেজ রোকনউদ্দিন। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গাছ লাগানো ছিল তার নেশা। সেই নেশাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় বাণিজ্যিক ফলচাষে।
মাত্র ৩০টি লটকনের চারা দিয়ে শুরু করা যাত্রা আজ চার বিঘা জমির দুটি সমৃদ্ধ বাগানে বিস্তৃত। ফল বিক্রির পাশাপাশি উন্নত জাতের কলম উত্পাদন করেও তিনি গড়ে তুলেছেন লাভজনক ব্যবসা। তার উদ্ভাবিত একটি উন্নত জাত স্থানীয়ভাবে এখন ‘নয়নপুরী লটকন’ নামে পরিচিত।
সমপ্রতি সরেজমিনে উপজেলার নয়নপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি লটকনগাছ ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে থোকায় থোকায় হলুদাভ পাকা লটকন। মৌসুম শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকাররা বাগানে এসে ফলের দরদাম করছেন। আবার অনেকে আসছেন উন্নত জাতের কলম কিনতে কিংবা বাগান পরিদর্শন করতে।
হাফেজ রোকনউদ্দিন জানান, পড়াশোনা শেষ করে দীর্ঘদিন বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসায় ইমামতি করেছেন। তখন থেকেই বিভিন্ন ধরনের ফলগাছ লাগানোর প্রতি তার আগ্রহ ছিল। পরে লটকন একটি লাভজনক ফল হিসেবে জানতে পেরে ২০১৮ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলা থেকে ৩০টি চারা এনে প্রথম বাগান করেন।
তিনি বলেন, “পরবর্তীতে একটি পুরনো বাগানসহ প্রায় ২০০টি গাছ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করি। কিন্তু শুরুতেই বড় ধাক্কা খাই। অনেক গাছ পুরুষ হওয়ায় আশানুরূপ ফলন পাইনি। এরপর নিজেই কলম করার কৌশল শিখে ভালো ফলনশীল গাছ নির্বাচন করে নতুন করে কলম তৈরি করি। সেখান থেকেই উন্নত জাতের বাগান গড়ে ওঠে।”
রোকনউদ্দিন জানান, গত আট বছরে ৮ থেকে ১০টি জাত নিয়ে কাজ করেছেন। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দুটি জাতকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলে মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতের ফল আকারে বড়, অত্যন্ত মিষ্টি এবং বাজারে এর চাহিদাও বেশি।
তিনি বলেন, “এই উন্নত জাতটির নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি স্মৃতি। কৃষিভিত্তিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর উপস্থাপক শাইখ সিরাজ আমার বাগান পরিদর্শনে এসে ফল দেখে গ্রামের নাম অনুসারে ‘নয়নপুরী লটকন’ নাম রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে এ নামেই পরিচিতি পেয়েছে জাতটি।”
বর্তমানে চার বিঘা জমির দুটি বাগানে লটকনের চাষ করছেন রোকনউদ্দিন। ফল বিক্রির পাশাপাশি উন্নত জাতের কলম উত্পাদন এখন তার আয়ের অন্যতম প্রধান উত্স। এক বছরের একটি কলম ১০০ টাকা এবং দেড় থেকে দুই বছরের কলম ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষক ও উদ্যোক্তারা তার বাগানে এসে কলম সংগ্রহ করেন।
তিনি বলেন, “আমি সবসময় ভালো মানের কলম দেয়ার চেষ্টা করি। কারণ ভালো জাতের চারা না হলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই পরীক্ষিত ও অধিক ফলনশীল গাছ থেকেই কলম তৈরি করি।”
লটকন চাষের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি স্বল্প পরিচর্যার একটি লাভজনক ফল। গর্ত করে উন্নত জাতের কলম রোপণ করলেই হয়। এরপর পরিচর্যার খরচও তুলনামূলক কম। চার থেকে পাঁচ বছর পর গাছে ফল আসে এবং গাছ যত বড় হয়, ফলনও তত বাড়তে থাকে। তবে টবে বা বাড়ির ছাদে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের চাষ সম্ভব নয়।
বর্তমানে তার বাগানের লটকন গাছ থেকেই পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি মণ লটকন ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতেই তিনি প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। ভরা মৌসুমে বিক্রি আরও বাড়বে বলে আশা করছেন। নিজের বাগানের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাগানের লটকনও তিনি পাইকারিভাবে কিনে বাজারজাত করেন।
গফরগাঁও উপজেলা থেকে চারা কিনতে আসা মো. এনামুল হক বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোকন ভাইয়ের বাগান দেখেছিলাম। পরে সরেজমিনে এসে ফল খেয়ে দেখি সত্যিই খুব মিষ্টি। তাই ৩২টি কলম কিনেছি। বাড়ির পতিত জমিতে লাগাব। ফলন ভালো হলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান করব।”
নয়নপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, “আমি এই বাগান থেকে ১০০টি চারা নিয়েছি। তাই তার চারার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে।”
স্থানীয় কৃষক বিল্লাল হোসেন বলেন, “রোকনউদ্দিনের বাগান থেকে ১০০টি চারা সংগ্রহ করেছি। তার উত্পাদিত লটকনের ফল আকারে বড়, দেখতে আকর্ষণীয় এবং স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এ চারার চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।”
স্থানীয় কৃষকদের মতে, কয়েক বছর আগেও এ এলাকায় লটকনের বাণিজ্যিক চাষ তেমন পরিচিত ছিল না। রোকনউদ্দিনের সাফল্যের পর এখন অনেকেই পতিত জমিতে লটকনের বাগান করার পরিকল্পনা করছেন।
ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, “উপজেলায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হচ্ছে। তিনি উন্নত মানের চারা উত্পাদন করছেন।
একসময় যিনি মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে মানুষকে ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দিতেন, আজ তিনি বাগানে দাঁড়িয়ে কৃষকদের দেখাচ্ছেন লাভজনক ফলচাষের পথ। শখ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা এখন শুধু তার নিজের অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়; বরং ভালুকাসহ আশপাশের এলাকার নতুন উদ্যোক্তাদের জন্যও হয়ে উঠেছে অনুপ্রেরণার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।




Comments