Image description

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এখন এক আতঙ্কের জনপদ। খুন, প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে জখম, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের ক্রমাগত বিস্তার এই অঞ্চলটিকে দেশের অন্যতম শীর্ষ অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে এখন মোহাম্মদপুরের নতুন নাম—‘সিটি অব ক্রাইম’। দেশের নতুন সরকারের জন্য এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এখন অন্যতম প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি এতটা বেগতিক যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরো মোহাম্মদপুর অঞ্চলটিকে বিশেষ লাল তালিকাভুক্ত (রেড জোন) করে গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় এনেছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এই অঞ্চলের অরাজকতা নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে অপরাধীদের চিরতরে নির্মূলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তবে দৈনিক মানবকণ্ঠের সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই কড়া বার্তার পরও মাঠপর্যায়ে অপরাধের ভেতরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি; বরং খোলস বদলে নতুন নতুন নামে সক্রিয় হচ্ছে অপরাধীরা।

পর্দার পেছনের বাস্তব চিত্র: মানবকণ্ঠের পূর্ববর্তী ও বর্তমান অনুসন্ধানী তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত এক বছরে মোহাম্মদপুর, বসিলা, ঢাকা উদ্যান এবং রায়েরবাজার এলাকায় অপরাধের গ্রাফ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। থানা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং মাঠপর্যায়ের হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই অঞ্চলের অপরাধের একটি গা শিউরে ওঠা চিত্র পাওয়া যায়।

বিগত ১২ মাসে এই এলাকায় মাদক কারবার, জেনেভা ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বিস্তার এবং কিশোর গ্যাংয়ের কোন্দলে ২৫ জনেরও বেশি মানুষ নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। এর মধ্যে নবোদয় হাউজিং, ঢাকা উদ্যান ও জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে ঘটে যাওয়া খুনের ঘটনাগুলো ছিল সবচেয়ে বীভত্স, যেখানে প্রকাশ্য দিবালোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করার মতো ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে বসিলা ও রায়েরবাজারের ভেতরের অংশ এবং বেড়িবাঁধ সংলগ্ন নির্জন এলাকাগুলো থেকে অন্তত ১২ থেকে ১৫টি সুনির্দিষ্ট অপহরণের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নথিতে এসেছে, যার বেশিরভাগই ঘটেছে মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যে। মূলত বিত্তশালীদের টার্গেট করে বা উঠতি ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে বেড়িবাঁধের নির্জন টিনের ঘরে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় করা এই চক্রগুলোর মূল কাজ।

সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ছিনতাই ও ডাকাতির ক্ষেত্রে। আসাদগেট, টাউন হল মোড়, শিয়া মসজিদ, নবোদয় হাউজিং, ঢাকা উদ্যান এবং বসিলা ব্রিজ এলাকায় গত এক বছরে অন্তত ৫০০টিরও বেশি প্রকাশ্য ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যায় প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অন্তত তিন থেকে চার গুণ বেশি। আইনি জটিলতা, পুলিশের হয়রানি এড়ানো এবং অপরাধীদের পরবর্তী প্রতিশোধের ভয়ে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশই থানায় গিয়ে মামলা বা সাধারণ ডায়েরি করেন না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গভীর উদ্বেগ ও কঠোর বার্তা: মোহাম্মদপুরের এই ক্রমবর্ধমান অরাজকতা ও আইনশৃৃঙ্খলা রক্ষায় চরম অবনতি দেশের নতুন সরকারের নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। গত ২০ জুন (২০২৬) সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ অবদান রাখা পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ মোহাম্মদপুর প্রসঙ্গে সরকারের অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কথা জানান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় ও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘মোহাম্মদপুর এলাকা বহু বছর ধরেই অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে রয়েছে। এই মোহাম্মদপুরকেও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হবে। এখানকার অপরাধীদের নির্মূল করা হবে। দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালনের বিষয়ে বর্তমান সরকার শুরু থেকেই জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।’ তিনি বলেন, বিগত সময়ে পুলিশের ওপর হামলা এবং থানায় অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর মানুষের মনে যে ধারণা হয়েছিল পুলিশ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে, তা ভুল প্রমাণ করে পুলিশ এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠে কাজ করছে। আগের যেকোনো সরকারের তুলনায় বর্তমান প্রশাসন অনেক বেশি গতিশীল ও দ্রুততার সাথে অপরাধ দমনে কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন।

ক্রাইম অ্যানালিস্ট ও সমাজবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ:  দেশের প্রবীণ অপরাধ বিজ্ঞানী, সমাজ গবেষক এবং স্থানীয় প্রবীণ নাগরিকরা মোহাম্মদপুরের এই স্থায়ী সংকটের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, মোহাম্মদপুরের মূল ক্ষত লুকিয়ে আছে ‘জেনেভা ক্যাম্প’-এর ভেতরে। এই ক্যাম্পটি এখন কেবল মাদক বিক্রির কেন্দ্র নয়, এটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের সবচেয়ে বড় মজুদখানা। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ক্যাম্পের ভেতরের মাদক সিন্ডিকেটগুলো আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, যারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পুরো মোহাম্মদপুরে অস্থিরতা জিইয়ে রাখছে।

‘অ্যালেন গ্রুপ’, ‘হিটলার গ্রুপ’, ‘ড্যাগার গ্রুপ’ কিংবা ‘লড়াকু গ্রুপ’-এর মতো কিশোর গ্যাংগুলো এখন আর কেবল পাড়ার মোড়ে আড্ডা দেয় না। তারা এখন বিভিন্ন কোডেড মেসেজিং অ্যাপ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে সুসংগঠিত। পুলিশের মুভমেন্টের খবর তারা প্রযুক্তির মাধ্যমে আগেভাগেই পেয়ে যায়, ফলে অভিযান শুরুর আগেই তারা স্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।

বিগত সরকারের পতনের পর পুরোনো রাজনৈতিক অপরাধ চক্রগুলো গা-ঢাকা দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে ফুটপাত, কাঁচাবাজার, লেগুনা স্ট্যান্ড এবং নতুন নির্মাণাধীন ভবন থেকে চাঁদা তোলার জন্য রাতারাতি নতুন ‘বড় ভাই’ বা গডফাদারদের জন্ম হয়েছে। অর্থাৎ, চাঁদাবাজির খাতগুলো একই রয়ে গেছে, শুধু টাকার ভাগ নেওয়া হাতগুলো বদলেছে।

বসিলা ও রায়েরবাজার সংলগ্ন বিস্তীর্ণ বেড়িবাঁধ এলাকা দিয়ে ঢাকার বাইরে (যেমন কেরানীগঞ্জ, সাভার বা আমিনবাজার) থেকে অপরাধীরা এসে অপরাধ করে খুব সহজেই নদী পার হয়ে বা রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে। ঢাকার এই অন্যতম প্রধান প্রবেশমুখে স্থায়ী ও আধুনিক চেকপোস্টের অভাব এই সংকটকে আরও ঘনিভূত করেছে।

আতঙ্কে কাটছে সাধারণ মানুষের রাত: দৈনিক মানবকণ্ঠের অনুসন্ধানী দল সরেজমিনে মোহাম্মদপুর টাউন হল, শিয়া মসজিদ মোড় এবং ঢাকা উদ্যান এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নবোদয় হাউজিংয়ের এক গৃহিণী বলেন, সন্ধ্যা ৭টার পর আমরা আর মেয়েদের নিয়ে বাসার বাইরে বের হতে পারি না। রিকশা বা সিএনজি থেকে টান দিয়ে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যাওয়া এখানে ডালভাত। বাধা দিলে সরাসরি চাকু বসিয়ে দেয়। একইভাবে ঢাকা উদ্যান এলাকার এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি ও যৌথ বাহিনীর অভিযানকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কিন্তু সমস্যা হলো, পুলিশ বা সেনাবাহিনী যখন ব্লক রেইড দেয়, তখন এলাকা দু-তিন দিন শান্ত থাকে। তারা চলে গেলেই আবার যে খোদাই সেই খোদাই। আমাদের প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান।