Image description

দেশের রাজস্ব আদায়ের প্রধান চালিকাশক্তি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভেতরে এক শ্রেণীর কর্মকর্তার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী চক্র। প্রাতিষ্ঠানিক আচরণবিধি এবং নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে এই চক্রটি বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ী, সফল উদ্যোক্তা ও সাধারণ করদাতাদের ফোনে কলের মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। ট্যাক্স ফাইল পুনর্মূল্যায়ন, কর ফাঁকির সাজানো মামলা বা রাজস্ব ফাঁকির ভয় দেখিয়ে তারা করদাতাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে। 

টাকার বিনিময়ে এক পক্ষের হয়ে অন্য পক্ষকে রাজস্ব নোটিশ বা হয়রানিমূলক আকস্মিক তদন্তের জালে ফাঁসানোর এই বিপজ্জনক খেলায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন দেশের সৎ ও নিয়মিত করদাতারা। ২০২৫ সালের মে মাসের আন্দোলন থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই চক্রের একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন অপতত্পরতার তথ্য বেরিয়ে আসছে, যা এখন সরকারের উচ্চমহলের নির্দেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারমূলক নজরদারির তালিকায় স্থান পেয়েছে।

সাধারণত যেকোনো করদাতার ফাইলে কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা রাজস্ব ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তা প্রাতিষ্ঠানিক নোটিশ এবং দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে জানানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই সিন্ডিকেটের কাজের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমে এই চক্রটির সদস্যরা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিভিন্ন সফল ব্যবসায়ী বা ধনী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে এবং গোপনে তাদের ট্যাক্স ফাইল ও ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য হাতিয়ে নেয়। এরপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আনুষ্ঠানিকতা না মেনেই সরাসরি ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর কিংবা এনক্রিপটেড যোগাযোগের অ্যাপ ব্যবহার করে গভীর রাতে বা অসময়ে করদাতাকে ‘কল’ করা হয়। সেই ফোনে করদাতাকে বোঝানো হয় যে, তার ফাইলে এমন বড় ধরনের ফাঁকি ধরা পড়েছে যা ওপরের মহলে গেলে তার ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে এবং তাকে জেলেও যেতে হতে পারে। 

করদাতার মনে এই আতঙ্ক সৃষ্টির পর ওই কর্মকর্তা নিজে সরাসরি কোনো অর্থ দাবি না করে নির্দিষ্ট কিছু দালাল, কনসালট্যান্ট বা তাদের বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীর ঠিকানা ধরিয়ে দেন। এই গোপন সমঝোতা বা ফয়সালার টেবিলে একেকটি ফাইল থেকে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভুক্তভোগী এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে তীব্র ক্ষোভের সাথে জানান, তার ফাইল সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিক থাকা সত্ত্বেও মাঝরাতে একজন পদস্থ কর্মকর্তা তাকে ফোন করে ব্যাংক হিসাব জব্দের ভয় দেখান এবং পরবর্তীতে তার নির্দেশিত দালালের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার পরেই কেবল পরিস্থিতি শান্ত হয়, যা কোনো কর আদায় নয় বরং প্রকাশ্য প্রাতিষ্ঠানিক দস্যুতা।

অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলতে হলে এনবিআরকে সম্পূর্ণভাবে ‘ফেসলেস’ বা করদাতা ও কর্মকর্তার সরাসরি মুখোমুখি সংযোগহীন কর ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। কর নির্ধারণ, রিটার্ন দাখিল এবং অডিটের প্রক্রিয়াটি শতভাগ অনলাইনের আওতায় এনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনা করতে হবে। মানুষের হস্তক্ষেপ যত কমবে, অসাধু কর্মকর্তাদের এই ধরনের গোপন ফোনে হুমকি দেওয়ার সুযোগ ততটাই বন্ধ হয়ে যাবে। দুর্নীতি দমন কমিশন এবং সরকারের এই যৌথ শুদ্ধি অভিযান যদি মাঝপথে থমকে যায় বা অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, তবে দেশের সত্ করদাতাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি এক গভীর ও অপরিবর্তনীয় মহাবিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে।

 ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান মনসুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এনবিআরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করদাতাদের ব্যক্তিগত ফোনে কল বা বার্তা পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার যে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে, তা কেবল ক্ষমতার অপব্যবহার নয়, বরং এটি সরাসরি একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রীয় অপরাধ। যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা আইনি নোটিশের তোয়াক্কা না করে অন্ধকার পথে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক গোপনীয়তা ফাঁসের ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন এবং সমাজে ব্যক্তিগত রেষারেষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হন, তখন রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের নূন্যতম আস্থাটুকুও ধূলিসাত্ হয়ে যায়। টিআইবি মনে করে, দুর্নীতি দমন কমিশন যে তদন্ত শুরু করেছে তা কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবে যেন স্তিমিত না হয়। এই রাঘববোয়ালদের শুধু বদলি বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক আইএমএফ কর্মকর্তা ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এনবিআরের ভেতর সুনির্দিষ্ট কিছু চক্র করদাতাদের যেভাবে হয়রানি করছে, তা অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই দীর্ঘদিনের একটি ওপেন সিক্রেট বিষয়। যখন একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে কেউ ব্যক্তিগত বা করপোরেট যুদ্ধ জয়ের হাতিয়ার বানায়, তখন পুরো কর ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস চিরতরে উঠে যায় এবং সত্ করদাতারা কর দিতে নিরুত্সাহিত হন। মে মাসের তীব্র সংকটের পর সরকার ও দুদক যৌথভাবে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং একে আরও বেগবান করা উচিত। শুধু বরখাস্তের মতো প্রশাসনিক সাজা দিয়ে এই গভীর রোগ নিরাময় সম্ভব নয়, এদেরকে প্রচলিত ফৌজদারি আইনে কঠিনতম সাজার মুখোমুখি করতে হবে।’

এ বিষয়ে রাজস্ব বোর্ডের পরিচালক (প্রশাসন) খালিদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে প্রতিনিয়তই তদন্ত করছি এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কোন কর্মকর্তা যদি করদাতাদের হয়রানি করেন- এবং সেসব অভিযোগ আমাদের কাছে আসে, আমরা খুব দ্রুত অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি।’