সংস্কারের অভাবে জৌলুস হারাচ্ছে ৫৫০ বছরের প্রাচীন মসজিদকুঁড়
খুলনার উপকূলঘেঁষা জনপদ কয়রা উপজেলার মসজিদকুঁড় গ্রামে শতাব্দী প্রাচীন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক 'মসজিদকুঁড় মসজিদ'। সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির এই অনন্য স্মারকটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ইসলাম ধর্ম বিস্তারের এক জীবন্ত দলিল। তবে কালের বিবর্তনে এই প্রাচীন নিদর্শনের অনেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন এর জরুরি সরকারি সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন বলে দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
খুলনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরে কয়রা উপজেলার আমাদি ইউনিয়নে কপোতাক্ষ নদের পূর্ব তীরে এই মসজিদের অবস্থান। ইতিহাস ও স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৪৫০ থেকে ১৪৯০ সালের মধ্যে হযরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর দুই প্রিয় শিষ্য বুড়া খান ও তার ছেলে ফতেহ খান আমাদি গ্রামে কাছারি স্থাপন করে এ অঞ্চল শাসন করতেন। ওই সময়কালেই তারা এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। প্রায় ৪৫ একর জায়গার ওপর ইট-সুরকি দিয়ে নির্মিত এই মসজিদটি দক্ষিণ বাংলার অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা।
ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি একসময় বন-জঙ্গলে ঢাকা পড়ে এবং মাটির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। জনশ্রুতি আছে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জঙ্গল পরিষ্কার করে এবং খনন কার্যের মাধ্যমে মসজিদটি উদ্ধার করা হয় বলে এর নাম হয় ‘মসজিদকুঁড়’ (অর্থাৎ কুঁড়ে বা খুঁড়ে বের করা)। একসময় মসজিদের পাশে বুড়া খান ও ফতেহ খানের কাছারিবাড়ি ও সমাধি থাকলেও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যায় তা বিলীন হয়ে গেছে।
মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বর্গাকার এই মসজিদের বাইরের প্রতি পাশের মাপ ১৬.৭৬ মিটার এবং ভেতরের মাপ ১২.১৯ মিটার। মসজিদের পশ্চিম পাশের কিবলামুখী দেওয়াল বাদে বাকি তিন দেওয়ালে তিনটি করে মোট ৯টি প্রবেশদ্বার রয়েছে। এর মধ্যে মাঝখানের প্রবেশদ্বারগুলো তুলনামূলক বড়। মসজিদের ভেতরে চারটি সুউচ্চ স্তম্ভের ওপর ছাদ নির্মিত, যা ভেতরের অংশকে ৯টি সমবর্গক্ষেত্রে ভাগ করেছে এবং প্রতিটি বর্গক্ষেত্রের ওপর একটি করে গম্বুজ রয়েছে। একসময় মসজিদের দেওয়ালে নান্দনিক পোড়ামাটির বা টেরাকোটার নকশা থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার অনেক অংশই এখন খসে পড়েছে।
আমাদি ইউনিয়নের বাসিন্দা সেরতাজ গাজী জানান, সুলতান মাহমুদ ফরিদ খাঁর আমলে খানজাহান আলী (রহ.) যখন দক্ষিণাঞ্চলে ধর্ম প্রচারে আসেন, তখন তার দুই শিষ্য বুড়া খান ও ফতেহ খান এখানে মসজিদটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে এর পোড়ামাটির কারুকাজগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই প্রাচীন সম্পদ রক্ষা করতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
মসজিদ কমিটির সহ-সভাপতি আইয়ুব হোসেন সানা ও স্থানীয় বাসিন্দা এখলাস উদ্দিন জানান, বর্তমানে মসজিদে নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও জুম্মার নামাজ আদায় হয়। জুম্মার দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ মুসল্লির সমাগম হওয়ায় মসজিদের ভেতরে জায়গা সংকুলান হয় না। স্থানীয়দের সহায়তায় এবং ছোটখাটো সংস্কার কাজের মাধ্যমে মসজিদটি টিকিয়ে রাখা হলেও এর পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের সামর্থ্য এলাকাবাসীর নেই। বিশেষ করে মসজিদে একজন স্থায়ী ইমাম ও মোয়াজ্জিন রাখার জন্য সরকারি সহযোগিতা এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
ঐতিহাসিক এই মসজিদটি কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, এটি পর্যটকদের জন্যও এক আকর্ষণীয় স্থান। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও সরকার এই প্রাচীন সুলতানি স্থাপত্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments