Image description

কাঠফাটা রোদ কিংবা ঝুম বৃষ্টি—কোনো কিছুই থামাতে পারে না আনিছ শেখকে। বয়স ৭২ বছর। শরীরের এক পাশ প্রায় অচল। হাঁটতে গেলেই শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়, কথা বলার সময়ও জড়িয়ে আসে উচ্চারণ। তবুও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন কাঁধে পানির বোঝা নিয়ে মোংলা নগরীর রাস্তায় হেঁটে চলেন তিনি।

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার কুমারখালী এলাকার আরাজী মাকড়ঢোনে বসবাস করেন মৃত মকবুল শেখের ছেলে আনিছ শেখ। দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে পানি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘পানিওয়ালা আনিছ’ নামে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রমে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসীর কাছে তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। অনেকের কাছে মোংলার এই মানুষটি যেন সত্যিকারের ‘লৌহমানব’।

১৯৮৪ সাল থেকে পানি বিক্রির কাজ করছেন আনিছ শেখ। তাঁর সংসারে রয়েছে তিন মেয়ে। অর্থের অভাবে দুই মেয়েকে অষ্টম শ্রেণি এবং আরেক মেয়েকে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াতে পারেননি। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রতিবন্ধকতা হার মানাতে পারেনি

আনিছ শেখের শরীরের এক পাশ ঠিকমতো কাজ করে না। প্রায় অচল হয়ে থাকা শরীর নিয়ে হাঁটাচলা করাই তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে শরীরের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। হাঁটার সময় শরীর দুলতে থাকে, ভারসাম্য ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। কথা বলার সময়ও শারীরিক অসুবিধার ছাপ স্পষ্ট।

তারপরও কারও কাছে হাত পাতেননি আনিছ। ভিক্ষা কিংবা অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের শ্রমে জীবিকা নির্বাহের পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রম করে চলেছেন।

কাঁধে পানির বোঝা, সঙ্গে জীবনসংগ্রাম

সকাল হলেই হাতে বাঁশের লাঠি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন আনিছ শেখ। কাঁধে থাকে বাঁশের তৈরি বহনের ব্যবস্থা, দুই পাশে ঝোলানো পানির পাত্র। এরপর ধীরে ধীরে হেঁটে মোংলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় পানি বিক্রি করেন তিনি।

৭২ বছর বয়সে একজন সুস্থ মানুষের মতো দ্রুত চলাফেরা করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন তাঁর জন্য একেকটি পরীক্ষা। শরীর দুলতে থাকে, হাঁটতে কষ্ট হয়। কিন্তু জীবিকার তাগিদে থেমে থাকার সুযোগ নেই।

রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে দিনের পর দিন এভাবেই চলছে তাঁর জীবন। বয়স ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁকে দুর্বল করলেও হার মানাতে পারেনি তাঁর মনোবল।

আনিছ শেখের জীবন যেন বলে দেয়—শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের পথচলার শেষ কথা নয়। আত্মসম্মান, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে। মোংলার রাস্তায় কাঁধে পানির বোঝা নিয়ে হেঁটে চলা আনিছ তাই শুধু একজন পানি বিক্রেতা নন; তিনি সংগ্রামী মানুষের এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।

এসএ