Image description

দীর্ঘদিন ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চূড়ান্তভাবে নিরসনে একটি নতুন চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এদিকে, তেহরানের এই নতুন প্রস্তাব এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অনুরোধে ইরানে পূর্বনির্ধারিত একটি বড় আকারের সামরিক হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। 

সোমবার (১৮ মে) মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক কর্মকর্তা এবং হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মঙ্গলবার (১৯ মে) ইরানের ওপর একটি বড় ধরনের সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। তবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের নেতাদের অনুরোধে তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ওই নেতারা তাঁকে জানিয়েছেন যে ইরানের সঙ্গে বর্তমানে ‘গুরুতর আলোচনা’ চলছে এবং একটি গ্রহণযোগ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, “আমি সামরিক নেতাদের নির্দেশ দিয়েছি আপাতত হামলা না চালাতে। তবে যেকোনো মুহূর্তে ইরানের ওপর পূর্ণাঙ্গ ও বড় আকারের আক্রমণ চালানোর জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।” 

হোয়াইট হাউসের এক অনুষ্ঠানে তিনি আরও যোগ করেন, একটি ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হয়েছে এবং তিনি আশাবাদী যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত রেখে একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

ইরানের বৈদেশিক সামরিক মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পাকিস্তান তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের এই নতুন প্রস্তাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে স্থগিত রাখা।
২. উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করা।
৩. গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ পর্যায়ক্রমে পুনরায় খুলে দেওয়া।

অন্যদিকে, ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, আলোচনা চলাকালীন তেহরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই তথ্যের কোনো স্বাধীন সত্যতা এখনো পাওয়া যায়নি।

এত কিছুর পরেও আলোচনার টেবিলের চিত্রটি এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরান বারবার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করায় একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর টোল আরোপ নিয়ে তেহরানের অনমনীয় অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে ড্রোন হামলার ঘটনা আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান বর্তমানে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। মুদ্রাস্ফীতি এবং জনগণের অসন্তোষের মধ্যে দেশটিতে ব্যাপক ধরপাকড় ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়া গেছে। 

‘দ্য হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি’ (এইচআরএএনএ)-এর তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানে অন্তত ৪,০২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ২৬ জন রাজনৈতিক বন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সংঘাতের ফলে ইরানে অন্তত ৩,৬৩৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১,৭০১ জনই বেসামরিক নাগরিক।

এদিকে, গত ১৬ এপ্রিল ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও সেখানে অস্থিরতা কমেনি। সোমবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং হিজবুল্লাহও পাল্টা হামলার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ৪৫ দিনের একটি নতুন যুদ্ধবিরতির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বড় ধরনের কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাচ্ছেন না, আবার ইরানের পক্ষ থেকেও অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে একটি চুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তবে উভয় পক্ষের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও কঠিন শর্তাবলি এই শান্তি প্রক্রিয়াকে এখনো অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।