ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ধীরগতির হলেও দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘দুর্গবেষ্টনী’ বা ‘ফোর্ট্রেস বেল্ট’ ক্রমেই চাপে পড়ছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের সাম্প্রতিক আশাবাদও কিছুটা ম্লান হয়ে আসছে। ডনবাস অঞ্চলে ইউক্রেনের অন্যতম শেষ শক্ত ঘাঁটি ক্রামাতোরস্কের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে রুশ বাহিনী। শহরটির প্রায় সব সেতু ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রতিদিনই সেখানে গাইডেড বোমা ও ড্রোন হামলা চলছে।
ইউক্রেনের ৯৩তম মেকানাইজড ব্রিগেডের প্রেস কর্মকর্তা ইরিনা রিবাকোভা বলেন, গত কয়েক সপ্তাহের পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ’। তাঁর ভাষ্য, দিনে কয়েক ডজন হামলা হচ্ছে। এতে গাড়ি, বিদ্যুৎ ও সেবা-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, আবাসিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন ও গ্যারেজে আগুন ধরছে।
তিনি বলেন, সন্ধ্যা ও সকালে শহরের রাস্তায় প্রায় কাউকেই দেখা যায় না। দিনের বেলাতেও মানুষ চলাচলের সময় অস্ত্র সঙ্গে রাখছেন। কারণ, সর্বত্র ড্রোনের উপস্থিতি এবং যেকোনো মুহূর্তে হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনারের কিয়েভ সফর কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হওয়ার পর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে ইউক্রেনকে কিছুটা পিছিয়ে পড়া অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। অথচ বসন্তে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন—তখন ইউক্রেন রাশিয়ার দখলের চেয়ে বেশি ভূখণ্ড পুনর্দখল করছিল।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের (আইএসডব্লিউ) রাশিয়া-বিষয়ক বিশ্লেষক জেনি ওলমস্টেড বলেন, দ্রুত কোনো বড় ধরনের অগ্রগতি রাশিয়ার জন্য এখনো কঠিন। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি মস্কোর অনুকূলে কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে।
তাঁর মতে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনীয় প্রতিরক্ষা ভেদ করে ছোট ছোট দলে অনুপ্রবেশ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ধীরে ধীরে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের দিকে এগোচ্ছে এবং কোস্তিয়ান্তিনিভকাতেও অগ্রসর হচ্ছে। তবে এই অগ্রযাত্রার গতি খুবই ধীর।
আইএসডব্লিউর হিসাব অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ১২৪ বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ডে অগ্রসর বা অনুপ্রবেশ করতে পেরেছে। গত বছরের একই মাসে দখল করা ভূখণ্ডের তুলনায় এটি প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
তবে এই অগ্রযাত্রার জন্য মস্কোকে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হিসাবে, রাশিয়া প্রতি মাসে প্রায় ৪০ হাজার সেনা হারাচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখলে তাদের প্রায় ৩৪০ জন করে হতাহত হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার মূল স্তম্ভ
রাশিয়ার ধীরগতির অগ্রযাত্রা সত্ত্বেও ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো পূর্বাঞ্চলের চারটি শিল্পনগরী নিয়ে গড়ে ওঠা ‘ফোর্ট্রেস বেল্ট’। স্লোভিয়ানস্ক, ক্রামাতোরস্ক, দ্রুজকিভকা ও কোস্তিয়ান্তিনিভকা—এই চার শহর ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ডনবাসের অবশিষ্ট অংশ রক্ষার পাশাপাশি ইউক্রেনের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্যও এই প্রতিরক্ষা বেষ্টনী গুরুত্বপূর্ণ। শহরগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান, জনবসতি এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগ মিলে পশ্চিমের অপেক্ষাকৃত সমতল ও কম জনবসতিপূর্ণ এলাকার আগে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরোধক তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, রাশিয়া যদি এই প্রতিরক্ষা বেষ্টনী ভেঙে ফেলতে পারে, তাহলে এরপর ইউক্রেনের আরও গভীরে তুলনামূলক দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
এ কারণেই গত সাড়ে চার বছরে ইউক্রেন এসব শহরকে ঘিরে বিপুল সম্পদ ব্যয় করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ‘দুর্গবেষ্টনী’ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বেষ্টনীর দক্ষিণ প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ শহর কোস্তিয়ান্তিনিভকা কার্যত ইউক্রেনের একটি শক্ত ঘাঁটি হিসেবে হারিয়েছে। প্রায় এক বছর ধরে শহরটি দখলের চেষ্টা চালিয়ে আসার পর রুশ বাহিনী সেখানে প্রবেশ করেছে। শহরের উত্তরে এখনো ইউক্রেনীয় প্রতিরোধের কিছু অংশ থাকলেও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে শহরটির গুরুত্ব অনেকটাই কমে গেছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে শহর
পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার কৌশলও একই ধরনের। দ্রুত কোনো শহর দখল করে অবকাঠামো অক্ষত রাখার পরিবর্তে রুশ বাহিনী ধীরগতির ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে শহরগুলো ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
বাখমুত দখলে রুশ বাহিনীর প্রায় নয় মাস সময় লেগেছিল। আর গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র পোকরভস্ক দখল করতে সময় লেগেছে প্রায় দুই বছর। শেষ পর্যন্ত শহর দুটির বেশির ভাগ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায় এবং ইউক্রেনের জন্য এগুলোর কৌশলগত গুরুত্বও হারিয়ে যায়। তবে রাশিয়ার প্রতিটি ছোট অগ্রগতিও প্রচারণার ক্ষেত্রে বড় সুবিধা তৈরি করছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবার বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধের লক্ষ্য থেকে তিনি সরে আসবেন না। এসব লক্ষ্যের মধ্যে দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক—দুই অঞ্চল পুরোপুরি দখলের বিষয়টিও রয়েছে।
বর্তমানে রাশিয়া দোনেৎস্কের প্রায় ৮১ শতাংশ এবং লুহানস্কের প্রায় পুরো অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। মস্কো এপ্রিলে লুহানস্ক পুরোপুরি দখলের দাবি করলেও কিয়েভ বলেছে, ওই অঞ্চলের কিছু এলাকায় এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
ক্রেমলিনের সহকারী ও আলোচক ইউরি উশাকভের দাবি, উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন বলেছেন, রুশ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে ‘দৃশ্যমান অগ্রগতি’ অর্জন করছে এবং শিগগিরই তাদের লক্ষ্য পূরণ হবে। তবে এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সিএনএন।
পুতিন এর আগে ১৪ বার ইউক্রেনের দুই অঞ্চল পুরোপুরি দখলের সময়সীমা নির্ধারণ করেছিলেন বলে আইএসডব্লিউ জানিয়েছে। সেসব সময়সীমা পার হয়ে গেলেও লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এবার বছরের শেষ নাগাদ বাকি ভূখণ্ড দখলের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
হামলার আশঙ্কায় বাড়ছে বেসামরিকদের দুর্ভোগ
ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত দোনেৎস্ক অঞ্চলের প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ সেখানে বসবাস করছেন। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশু। তবে দিন দিন তাদের জীবন কঠিন হয়ে উঠছে। ফ্রন্টলাইন এলাকার গ্রামগুলো থেকে বেসামরিকদের সরিয়ে নেয়ার কাজে নিয়োজিত ‘হোয়াইট অ্যাঞ্জেলস’ পুলিশের কর্মকর্তা হেন্নাদি ইউদিন বলেন, দোব্রোপিলিয়া ও আশপাশের গ্রামগুলোতে এখন গাড়ি নিয়ে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব।
তাঁর ভাষ্য, সেনারা পায়ে হেঁটে মানুষকে সরিয়ে আনছেন। এরপর পুলিশের সদস্যরা দোব্রোপিলিয়া থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে তাদের নিয়ে আসছেন। পুরো এলাকাটি মাইন পাতা এবং সেখানে ড্রোনের সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। ক্রামাতোরস্কেও এখনো অনেক বেসামরিক মানুষ বসবাস করছেন। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তাদের অনেকেই শহর ছাড়তে বাধ্য হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। শহরটি দীর্ঘদিন ধরে পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে থাকা ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পেছনের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ক্লান্ত সেনারা সেখানে ফিরে কয়েক দিনের বিশ্রাম নিয়ে আবার যুদ্ধে ফিরতেন। কিন্তু রুশ হামলা তীব্র হওয়ায় সেই সুযোগও এখন সীমিত হয়ে পড়েছে।
রিবাকোভা বলেন, ক্রামাতোরস্কে প্রতিদিন গোলাবর্ষণ হচ্ছে। গাইডেড বোমা ও বড় ধরনের হামলা চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি তিনি যে বাড়িতে থাকতেন, সেটিও রুশ বোমা হামলায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
বিশ্লেষক জেনি ওলমস্টেডের মতে, রুশ বাহিনী এখন মূলত ভবিষ্যৎ আক্রমণের জন্য যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। তিনি বলেন, ইউক্রেনের সামরিক সরবরাহব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা দুর্বল করার চেষ্টা করছে রাশিয়া। একই সঙ্গে সামনের অবস্থানে এবং শহরগুলোতে ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে রসদ পৌঁছানো কঠিন করে তুলছে মস্কো।
সূত্র: সিএনএন।
এমআর




Comments