আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয়—এমন তালাকের অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের ডিক্রি (রায়) বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না বলে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত স্পষ্ট করেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার, যা কোনোভাবেই বাবা-মায়ের তালাক সংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়।
সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় প্রদান করেন। রায়ে বলা হয়, কোনো সক্ষম আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত সেটি কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন কোর্ট (জারি আদালত) তা বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। শুধুমাত্র একটি নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছে—এই অজুহাতে ইতিপূর্বে দেওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন স্থগিত রাখা যাবে না।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে এক দম্পতির বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্ত্রী তার ও নাবালক সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের মামলা করেন। স্বামী দাবি করেন যে তিনি স্ত্রীকে আগেই তালাক দিয়েছেন, কিন্তু ফ্যামিলি কোর্টে তিনি সেই তালাক আইনত প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন। ফলে আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রি প্রদান করেন। পরবর্তীতে স্বামী নতুন একটি ঘোষণামূলক মামলা করে দাবি করেন যে তালাক কার্যকর হয়েছে এবং ওই মামলার অজুহাতে ভরণপোষণের ডিক্রি বাস্তবায়ন স্থগিত করার আবেদন করেন। নিম্ন আদালত সেই আবেদন খারিজ করলে বিষয়টি হাইকোর্টে আসে।
হাইকোর্ট রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, তালাক আইনত প্রমাণিত না হলে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটে না এবং তা ভরণপোষণ বা দেনমোহর পরিশোধে কোনো আইনি বাধা হতে পারে না। বিশেষ করে সন্তানের বিষয়ে আদালত কঠোরভাবে বলেন, ‘একজন পিতা কেবল তালাক সংক্রান্ত বিরোধের অজুহাতে তাঁর সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।’
রায়ে আরও বলা হয়, জারি আদালতের দায়িত্ব কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তারা নতুন করে তালাক বৈধ কি না—এমন প্রশ্নের বিচার করতে পারে না। আদালত নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রেখে স্বামীকে দেনমোহরের বকেয়া এবং স্ত্রী ও সন্তানের সকল বকেয়া ভরণপোষণ পরিশোধের নির্দেশ দেন।
আদালতে স্ত্রীর পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও ইফাত হাসান শাম্মি। স্বামীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম।
আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, "এই রায়টি পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় এমন তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা শিশুর অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। এটি নারী ও শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।"
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments