সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই যুগে জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তই যেন ভার্চুয়াল জগতে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকে। কোথাও খেতে যাওয়া থেকে শুরু করে ঘুরতে যাওয়া—সবই স্টোরি বা পোস্টের মাধ্যমে অন্যদের জানানো এখনকার ট্রেন্ড। এমনকি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনেকে মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি পোস্ট না করলে সম্পর্কটা যেন পূর্ণতা পায় না। তবে গবেষক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতি-প্রদর্শনের প্রবণতা আদতে সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা বলেন, “সুখী দম্পতিরা বাইরের স্বীকৃতির জন্য চিন্তা না করে বাস্তব মুহূর্তগুলো উপভোগে বেশি মনোযোগ দেন। সম্পর্ক ব্যক্তিগত রাখলে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, কারণ তখন দুজনের মধ্যে একটা একান্ত জগত তৈরি হয়—যেখানে বাইরের কোনো মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য বা নেতিবাচক নজর ঢুকতে পারে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্পর্কের নিখুঁত চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টার পেছনে অনেক সময় ‘তুলনা’ কাজ করে। অন্যের পোস্ট দেখে নিজের সম্পর্ককে বিচার করা বা অন্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে নিজেদের ছোটখাটো অসম্মতিগুলো বড় হয়ে ধরা দেয়। ডা. দিনা বলেন, “যারা সম্পর্ককে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন, তারা বাইরের মানুষ কী ভাবছে তা নিয়ে মাথা ঘামান না। ফলে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে এবং একে অপরের সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো সহজ হয়।”
সম্পর্ক গোপন বা ব্যক্তিগত রাখার সবচেয়ে বড় সুফল হলো নিরাপত্তার অনুভূতি। যখন দুজন মানুষ জানেন যে তাদের একান্ত মুহূর্তগুলো শুধু তাদেরই, তখন তারা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে একে অপরের কাছে নিজেকে মেলে ধরতে পারেন। কথা বলা, হাসি কিংবা ছোট ছোট স্পর্শ—সবকিছুতেই এক ধরনের মানসিক গভীরতা তৈরি হয়।
ডা. দিনা আরও সতর্ক করে বলেন, “সবকিছু পোস্ট করার অভ্যাসের ফলে মনের অজান্তেই একটা অদৃশ্য চাপ কাজ করে—‘লোকে কী বলবে?’ এই চাপ থেকে অনেক সময় সম্পর্কের আসল আনন্দ হারিয়ে যায়। নিখুঁত ছবি তোলা, আকর্ষণীয় ক্যাপশন লেখা আর লাইক-কমেন্টের জন্য অপেক্ষার ভিড়ে দুজনের মধ্যকার আসল সংযোগটি ফিকে হয়ে আসে।”
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সচেতন এবং প্রতিটি মুহূর্তের জন্য কৃতজ্ঞ থাকেন, তারা বেশি সুখী হন এবং তাদের মধ্যে হতাশা বা উদ্বেগের মাত্রা কম থাকে। সম্পর্ক ব্যক্তিগত রাখলে এই উপভোগের অনুভূতি আরও বাড়ে।
তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো—সম্পর্ক ব্যক্তিগত রাখা মানে এই নয় যে সবকিছু লুকিয়ে রাখা। পরিবার বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সম্পর্কের কথা জানানো স্বাভাবিক। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত পোস্ট করার চেয়ে বাস্তবের মুহূর্তগুলো একে অপরের সঙ্গে উদযাপন করা সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী সুখের জন্য অনেক বেশি কার্যকর।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments