Image description

ল্যাবরেটরির টেস্টটিউবের নিভৃত কোণ থেকে যিনি জ্বালিয়েছিলেন স্বনির্ভরতার অদম্য শিখা, তিনি বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ ও সফল শিল্পদ্যোক্তা আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পি সি রায়)। আগামীকাল ২ আগস্ট এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৬১ সালের এই দিনে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপোতাক্ষ নদের তীরের রাড়ুলী গ্রামে এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

বিজ্ঞানী পি সি রায়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে নানা কর্মসূচি পালিত হলেও, তাঁর জন্মভিটা খুলনার পাইকগাছায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয়েছে। তবে এই উদযাপনের মধ্যেও বিজ্ঞানীর স্মৃতিবিজড়িত পৈতৃক বাড়ির বর্তমান ভগ্নদশা এবং অবহেলার চিত্র সচেতন মহলের মনে ক্ষোভ ও বেদনার সৃষ্টি করেছে।

প্রশাসনের বর্ণাঢ্য আয়োজন
আগামীকালকের বিশেষ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে খুলনা জেলা ও পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে রাড়ুলীতে বিজ্ঞানীর স্মৃতিসৌধ ও বাসভবন চত্বরে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বিজ্ঞানীর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, স্মরণসভা, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিজ্ঞান মেলা ও কুইজ প্রতিযোগিতা। প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্থানীয়রা সাধুবাদ জানালেও তারা মনে করেন, কেবল দিবসকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে এই মনীষীর স্মৃতি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কপোতাক্ষের তীরে ঐতিহ্যের সংকট
পাইকগাছায় কপোতাক্ষ নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পি সি রায়ের পৈতৃক বাড়িটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। বহু চড়াই-উতরাই ও জবরদখলমুক্ত হওয়ার পর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করলেও, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক এই ভবনটি এখন ধ্বংসের মুখে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ১৭০টি স্তম্ভ, ৪৫টি দরজা এবং ১৩০টি জানালা সংবলিত এই সুবিশাল দোতলা বাড়িটির বিভিন্ন অংশে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। খসে পড়ছে ছাদের পলেস্তারা। ভবনের চূড়ায় থাকা ঐতিহাসিক সিংহমূর্তিটি এবং ভেতরের আসবাবপত্র বা স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। বর্ষাকালে ছাদ চুয়ে পানি পড়ায় অমূল্য এই কীর্তিটি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অথচ একটু সদিচ্ছা ও আধুনিক সংস্কারের ছোঁয়া পেলে এই স্থানটি হতে পারত দেশের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান ও ইতিহাস পর্যটন কেন্দ্র।

সর্বস্বত্যাগী এক সাধক
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কেবল একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, সমাজ-সংস্কারক, দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ। ১৮৯৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক থাকাকালীন ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’ আবিষ্কার করে তিনি বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখানো। নিজের বাসভবনে দেশীয় ভেষজ নিয়ে গবেষণা শুরু করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যালস’—যা ভারতবর্ষের প্রথম দেশীয় শিল্পায়নের ভিত্তি স্থাপন করে।

আজকের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য পি সি রায়ের জীবন এক বড় অনুপ্রেরণা। ১৯০৩ সালে হরিশ্চন্দ্র স্কুল, ১৯০৯ সালে জন্মভূমিতে সমবায় ব্যাংক এবং ১৯১৮ সালে বাগেরহাটে পি সি কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। জীবনের অর্জিত সমস্ত সম্পত্তি মানবকল্যাণে দান করে যাওয়া এই চিরকুমার মহাপুরুষের স্মৃতি আজ নিজ ভূমিতেই অনেকটা অবহেলিত।

প্রত্যাশা ও আবেদন
বাঙালি জাতিকে বিশ্বদরবারে সম্মানিত করার কারিগর পি সি রায়ের জন্মবার্ষিকীর এই লগ্নে দেশের বিজ্ঞানপ্রেমী ও শিক্ষার্থীদের একটাই দাবি—খুলনা জেলা প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর যেন দ্রুত একটি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ গ্রহণ করে। রাড়ুলীর এই ঐতিহাসিক বাসভবনটিকে একটি বিশ্বমানের ‘বিজ্ঞান জাদুঘর ও গবেষণা কেন্দ্র’ হিসেবে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।

যে মানুষটি নিজের জীবন দেশ ও দশের জন্য উৎসর্গ করেছেন, তাঁর জন্মভিটার এই জরাজীর্ণ দশা মুছে ফেলা আমাদের জাতীয় নৈতিক দায়িত্ব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে—এমনটাই প্রত্যাশা দেশবাসীর।

মানবকণ্ঠ/ডিআর