দীর্ঘ স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান পরবর্তী রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের ভূমিকা সুসংহত করতে এবং মুক্ত সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ‘স্বাধীন ঐক্যবদ্ধ সম্পাদকীয় প্লাটফর্ম’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ৩৫ জন সম্পাদক।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) এক যৌথ বিবৃতিতে সাংবাদিকতার সকল কালাকানুন ও রাজনৈতিক-করপোরেট প্রভাবমুক্ত হয়ে নির্ভীক সাংবাদিকতার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন তাঁরা।
বিবৃতিতে বলা হয়, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থায় মুক্ত সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে যে প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক বলয় তৈরি করা হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা এই মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গণমাধ্যমের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। সরকারি বিধিনিষেধের পাশাপাশি ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা স্বপ্রণোদিত হয়ে সত্য প্রকাশে বিরত থাকার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। এককভাবে কোনো সম্পাদকের পক্ষে এই ভয়ের দেয়াল ভাঙা সম্ভব নয়। তবে সম্পাদকরা সমষ্টিগতভাবে দৃঢ় অবস্থান নিলে তা প্রতিটি সাংবাদিকের মধ্যে সাহস জোগাবে। জনগণের জানার অধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানই পারে সংবাদকক্ষগুলোকে নির্ভীক সাংবাদিকতায় ফিরিয়ে আনতে।
বিবৃতিতে সম্পাদকরা উল্লেখ করেন, ফ্যাসিবাদী আমলে অনেক গণমাধ্যমের মালিকানা নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে চলে গিয়েছিল, যারা সাংবাদিকতাকে নিজেদের স্বার্থরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের নামে বশংবদ ভূমিকা, ফ্যাসিবাদের বয়ান তৈরি এবং বিভাজন ও বিদ্বেষের বিষে জর্জরিত করা হয়েছে সম্পাদকবৃন্দের মর্যাদা ও ঐক্যকে। এই করপোরেট ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পাদকীয় নীতিকে মুক্ত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সম্পাদকদের একটি শক্তিশালী ও আপসহীন ঐক্য থাকলে তারা মালিক পক্ষের অন্যায্য হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন প্রেশার গ্রুপের চাপ মোকাবিলা করতে পারবেন।
ফ্যাসিবাদী সরকার নিজেদের টিকিয়ে রাখতে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের মতো বিভিন্ন দমনমূলক আইন ব্যবহার করেছে উল্লেখ করে সম্পাদকরা বলেন, এই আইনগুলোর সংস্কার বা পূর্ণাঙ্গ বিলোপ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এসব দাবি আদায় সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সব ধারার সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সম্মিলিত ও নিয়মতান্ত্রিক চাপ। আমরা তেমন একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সম্পাদকদের ঐক্য শুধু অধিকার আদায়ের জন্য নয়, বরং নিজেদের আত্মশুদ্ধির জন্যও প্রয়োজন। একটি ঐক্যবদ্ধ ফোরামের মাধ্যমে সাংবাদিকতার বৈশ্বিক নীতি ও নৈতিকতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে, যেন গণমাধ্যম নিজেই নিজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারে এবং কোনো রাষ্ট্রীয় বা বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ না থাকে।
সম্পাদকরা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফ্যাসিবাদ সরাসরি বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া ক্ষত ও দোসররা সমাজের বিভিন্ন স্তরে সক্রিয় থাকে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে বিভিন্ন সংকটকালে সম্পাদকদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল। আজ আবার সেই সময় এসেছে। দেশের স্বার্থে এবং গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে বাংলাদেশের সম্পাদকদের এই ঐক্য হবে মুক্ত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের এক অপরিহার্য ‘নিরাপত্তা প্রাচীর’। এই প্রতিষ্ঠান গোষ্ঠী বিশেষের বদলে দল-মত নির্বিশেষে সব গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকবে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী সম্পাদকরা হলেন— শফিক রেহমান (যায়যায় দিন), মাহমুদুর রহমান (আমার দেশ), সালাহ উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর (নয়াদিগন্ত), আবদুল হাই শিকদার (যুগান্তর), আবু তাহের (বাংলাদেশ প্রতিদিন), মারুফ কামাল খান সোহেল (প্রতিদিনের বাংলাদেশ), হাসান হাফিজ (কালের কণ্ঠ), আযম মীর শহীদুল আহসান (সংগ্রাম), মোকাররম হোসেন (নিউ নেশন), শফিকুল আলম (ওয়াদা), সৈয়দ মেসবাহ উদ্দীন (বাংলাদেশের খবর), রেজাউল করীম লোটাস (ডেইলি সান), মোস্তফা কামাল (খবরের কাগজ), বেলায়েত হোসেন (ভোরের ডাক), ওবায়দুর রহমান শাহীন (জনতা), মো. শহিদুল ইসলাম (মানবকণ্ঠ), মো. সায়েম ফারুকী (রূপালী বাংলাদেশ), মনির হোসেন (খোলা কাগজ), ইলিয়াস খান (টাইমস অফ বাংলাদেশ), মোস্তাফিজুর রহমান বিপ্লব (বাংলাবাজার পত্রিকা), শেখ নজরুল ইসলাম (খবর সংযোগ), আবুল কাশেম মজুমদার (ক্যাপিটাল নিউজ), ব্যারিস্টার মো. মারুফ ইব্রাহীম আকাশ (খবরপত্র), শামসুল হক দুররানি (নওরোজ), শাহাদাত হোসেন শাহীন (গণমুক্তি), আফসার উদ্দিন চৌধুরী (কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম), সোহেল মাহবুব (নতুন প্রভাত, রাজশাহী), মাহবুবা পারভিন (অনির্বাণ, খুলনা), আজাদ আলাউদ্দিন (বাংলাদেশ বাণী, বরিশাল), শান্তনু ইসলাম সুমিত (লোকসমাজ, যশোর), খন্দকার মোস্তফা সরোয়ার অনু (দাবানল, রংপুর), মততাজ শিরিন ভরসা (যুগের আলো, রংপুর), আশরাফুল হক (প্রবাহ, খুলনা), মুকতাবিস উন নূর (জালালাবাদ, সিলেট) এবং সাইফুল ইসলাম (নিউ টাইমস, ময়মনসিংহ)।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments