Image description

ঘনিয়ে আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনকে সামনে রেখে গুরুত্ব পাচ্ছে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন। এ জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগকে প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধানেরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।  
 
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার বড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান করতে চাচ্ছে। কারণ এটা করতে পারলে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় কাজে লাগে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে, ফাস্টট্র্যাকভুক্ত আট প্রকল্পে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত গড় ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর গড় আর্থিক অগ্রগতি ৬৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
 
২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নেওয়া এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৬৮১ কোটি ৫ লাখ টাকা। গত মে মাস পর্যন্ত এসব প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৪৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খরচ করা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে। এই প্রকল্পে মে মাসে খরচ হয়েছে ৫৯ হাজার ৯৪৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা সরকারের ভালো উদ্যোগ। এতে দেশের মানুষ সুফল পাবে, অর্থনীতিতেও অবদান রাখবে। যেহেতু ঋণের টাকায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে যত দেরি হবে ঋণের সুদ তত বাড়বে।
 
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে কি না এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে নির্বাচনের প্রভাব থাকাটা স্বাভাবিক। কারণ সরকার তো তাদের বড় বড় কাজগুলো জনগণকে দেখাতে চাইবে। বড় বড় প্রকল্প এগিয়ে গেলে এটা সরকারের অর্জনের পালকে যুক্ত হয়। নির্বাচনি প্রচারণায় কাজে লাগে।  
 
এ বিষয়ে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পে সরকারের বিশেষ নজর রয়েছে। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে জনগণ সুফল পাবে সরকার সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এসব প্রকল্পে অগ্রগতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে। যাতে কোনোরকম বাধাগ্রস্ত না হয় এবং দ্রুততম সময়ে শেষ হয়।
 
ফাস্টট্র্যাকভুক্ত প্রকল্পগুলোর মধ্যে হলো-পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ এবং দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু-মায়ানমারের নিকটে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প। এসব প্রকল্পের কয়েকটি ইতিমধ্যে উদ্বোধন হয়েছে। আরও কয়েকটি উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে।
 
উদ্বোধন হওয়া পদ্মা সেতু সরকারের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্পের মধ্যে একটি। উদ্বোধনের পর থেকেই দেশের উন্নয়নে বড় অবদান রেখে চলেছে এ সেতু। তবে প্রকল্পের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। সবশেষ সংশোধন অনুযায়ী এ সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। গত মে পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৮ হাজার ৭৬৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। পুরো প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পটির মেয়াদ।
রাজধানীবাসীর বহুল প্রত্যাশিত মেট্রোরেল প্রকল্পের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ গত বছর ২৮ ডিসেম্বর উদ্বোধন হয়েছে। পুরো প্রকল্প শেষ হতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। মে পর্যন্ত প্রকল্পটিতে খরচ হয়েছে ২১ হাজার ৮৮৪ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি ৬৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এ ছাড়া ভৌত অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সংশোধিত ব্যয়সহ মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।
 
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে জটিলতায় পড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামগ্রিক অগ্রগতি তুলনামূলক কম হয়েছে। প্রকল্পের কাজ পুরোপরি শেষ না হলেও আগামী সেপ্টম্বরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সাল মেয়াদে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। শুরু থেকে মে পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৫৯ হাজার ৯৪৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ভৌত অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৫৩ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৫৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।  
 
পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পে চলতি বছরের মে পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৮ হাজার ৫১২ কোটি ৮ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি ৭২ দশমিক ৬৫ শতাংশ আর ভৌত অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য আগামী বছরের জুনের মধ্যে।
 
মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম প্রকল্পের অধীনে মাতারবাড়ী ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ১২টি প্রকল্প কাজ চলছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটি প্রথম সংশোধনীর পর ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। মে পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ৬৬১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি ৬২ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং সার্বিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৭৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। 
 
১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট যা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নামে পরিচিত। ২০০৯ সালের জুলাই থেকে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। গত মে মাস পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯২ দশমিক ৯০ শতাংশ।
 
পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর ৪ হাজার ৩৭৪ কোট টাকা ব্যয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি ২০১৫ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২৩ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৬২৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর্থিক অগ্রগতি ৮২ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৮৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
 
১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার  এবং রামু-মায়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। চলতি বছরের মে পর্যন্ত খরচ হয়েছে ৭ হাজার ৭৩০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৪২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। এ ছাড়া ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৮৫ শতাংশ।