মুসলিম বিশ্বের তিন প্রভাবশালী দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক সম্প্রতি ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) পবিত্র মক্কা নগরীতে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশ একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে চুক্তিটির সঙ্গে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মিল রয়েছে। যদিও যৌথ বিবৃতিতে এই প্রতিশ্রুতির আওতায় কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তিকে বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে ইসলামাবাদ দক্ষিণ এশিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি সম্ভাব্য নতুন নিরাপত্তা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান তুলে ধরছে।
কেন এখন এই প্রতিরক্ষা চুক্তি?
মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামো যখন যুদ্ধ ও পরিবর্তিত জোটের কারণে চাপে রয়েছে, ঠিক তখনই এই চুক্তি হলো। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক সংঘাতের প্রভাব পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এতে সৌদি আরবের জ্বালানি ও সার সরবরাহ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তেমনি আমদানিনির্ভর পাকিস্তান ও তুরস্কও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এক পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, আরও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো তিন দেশেরই অভিন্ন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ। শেষ পর্যন্ত এই অভিন্ন স্বার্থই তাদের চুক্তিতে সই করতে উৎসাহিত করেছে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও তিন দেশের উদ্বেগ রয়েছে। সৌদি আরব ও তুরস্ক আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হামলার শিকার হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় সীমান্ত অস্থিতিশীলতা নিজেদের ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্কের।
তুরস্কের ক্ষেত্রে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা নতুন করে বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। দেশটির আশঙ্কা, বাইরের শক্তিগুলো ইরানি কুর্দি মিলিশিয়াদের অস্ত্র দিলে পিকেকে-এর সঙ্গে চলমান শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল উপসাগরীয় দেশগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত ও হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।
পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি চুক্তিটিকে ‘উদীয়মান আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রথম বাস্তব ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার প্রবণতা আরও জোরালো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং গত কয়েক মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা সহযোগিতারই ধারাবাহিক ফল এটি।
২০২৫ সালের শেষ দিকে রিয়াদ ও ইসলামাবাদ একটি দ্বিপক্ষীয় পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করে। এর আওতায় প্রায় ৮ হাজার পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন করা হয়। তুরস্কও দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করে আসছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তিন দেশের মধ্যে গভীরতর নিরাপত্তা সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিণতিই হলো এই চুক্তি।
পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিক সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ
পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তির গুরুত্ব শুধু নিরাপত্তা বা ভূরাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত।
দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক সংকটে থাকা পাকিস্তান সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সেতু হিসেবে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছিল। তবে আঞ্চলিক সংঘাত বাড়ায় সেই নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের পুরোনো কৌশলকে এবার আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে ইসলামাবাদ। যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ, সেনা মোতায়েন ও অস্ত্র রপ্তানির মাধ্যমে সৌদি বিনিয়োগ, জ্বালানি খাতে সুবিধা এবং কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এক পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষায়, এ অর্থে পাকিস্তানের সামরিক শক্তি শুধু কৌশলগত সম্পদ নয়, অর্থনৈতিক সম্পদেও পরিণত হচ্ছে।
সৌদির অর্থ, তুরস্কের প্রযুক্তি, পাকিস্তানের সামরিক শক্তি
বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশের অংশীদারত্বে একে অপরের পরিপূরক সক্ষমতা এক জায়গায় মিলছে। সৌদি আরবের রয়েছে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তুরস্কের রয়েছে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও সামরিক শিল্প, আর পাকিস্তান দিতে পারে বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা।
পাকিস্তানের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহরিয়ার খান বলেন, এই সমন্বয়ে সৌদি আরব অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্ক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং পাকিস্তান মূল সামরিক শক্তি সরবরাহ করছে।
তার মতে, একসঙ্গে তিন দেশ এমন একটি নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে, যার সক্ষমতা শুধু প্রচলিত সেনা মোতায়েনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
সব মিলিয়ে ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার প্রবণতাকে আরও জোরালো করতে পারে। একই সঙ্গে সৌদি অর্থনীতি, তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতার সমন্বয় ভবিষ্যতে অঞ্চলটির কৌশলগত ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
এসএস




Comments