চাকরির মেয়াদ শেষ হতে তখনো প্রায় দুই বছর বাকি ছিল। ২০২৬ সালে স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই স্বেচ্ছায় অবসরে যান পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সাবেক সুপারিনটেন্ডেন্ট মো. মাজহারুল হক। তার এই আগাম অবসরকে ঘিরে নানা আলোচনা ও প্রশ্ন দেখা দিলে অনুসন্ধানে উঠে আসে তার ও স্ত্রী সানজিদা আক্তারের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের চাঞ্চল্যকর তথ্য। একই সঙ্গে অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাইয়ে দেয়া এবং দালালচক্রের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার লেনদেন ও অনুল্লিখিত তথ্য: অনুসন্ধানে প্রাপ্ত বিভিন্ন নথি ও তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, মো. মাজহারুল হক ও তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত পাঁচটি ব্যাংক হিসাবে এক কোটি টাকার বেশি জমা বা স্থিতির তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় এসব হিসাবে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য রয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, এক্সিম ব্যাংকের একটি হিসাব থেকে ১০ হাজার টাকা করে তিনটি মাসিক ডিপিএস চালু রয়েছে, যার মোট কিস্তি ৩০ হাজার টাকা। এছাড়া ঢাকা ব্যাংকের একটি হিসাব থেকে ২০ হাজার টাকার আরেকটি ডিপিএস পরিচালিত হচ্ছে। এসব হিসাব ছাড়াও আরও কিছু আর্থিক লেনদেন যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে, যেখানে দেখা গেছে তার ও তার স্ত্রীর নামীয় ব্যাংক হিসাবে কিছু বড় বড় লেনদেন হয়েছে যেসব তথ্য তিনি আয়কর নথিতে উল্লেখ করেননি।
ফ্ল্যাট, প্লট ও জমিসহ বিপুল স্থাবর সম্পদ: শুধু ব্যাংক হিসাব নয়, রাজধানী ও এর আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পদের তথ্যও পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঢাকার বাড্ডা, মাতুয়াইল, আশুলিয়া, সাভার ও উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাজহারুল হক ও তার স্ত্রীর নামে জমি, ফ্ল্যাট ও বাড়ির তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
মাতুয়াইল: ডেমরার মাতুয়াইল মৌজায় প্রায় ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ জমির ওপর একটি ফ্ল্যাট, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।
আশুলিয়া: আশুলিয়ার বড় পাড়াগাঁও এলাকায় ৮ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকার বেশি। এছাড়া বড় আশুলিয়া মৌজায় ২৪ দশমিক ৪২ শতাংশ জমি, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
উত্তরা: উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে একটি আবাসিক প্লটের তথ্য পাওয়া গেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা।
নারায়ণগঞ্জ: অন্যদিকে তার স্ত্রী সানজিদা আক্তারের নামে নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া এলাকায় জমি, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
রোহিঙ্গা পাসপোর্ট জালিয়াতি ও অবৈধ উপার্জনের অভিযোগ: সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উদ্ধার হওয়া এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য তার সরকারি চাকরির বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে পাসপোর্টসংক্রান্ত একটি প্রভাবশালী দালালচক্রের সঙ্গে তার গভীর সম্পৃক্ততা ছিল এবং অবৈধভাবে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাইয়ে দেয়ার মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন।
বক্তব্য এড়ানোর চেষ্টা ও আয়কর ফাঁকির সংশয়: এসব অভিযোগ ও সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মাজহারুল হক প্রথমে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘আপনি কে? এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। আমি এ বিষয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলতে রাজি নই।’ পরে তার ও তাঁর স্ত্রীর নামে পাওয়া নির্দিষ্ট সম্পদের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হলে তিনি সব সম্পদের কথা স্বীকার করেন এবং দাবি করেন, ‘আমার কিছু সম্পদ আছে। আমি দীর্ঘদিন ধরে জমিজমার ব্যবসা করি। সেই ব্যবসা থেকেই কিছু সম্পদ হয়েছে। এসব সম্পদের হিসাব আমার এবং আমার স্ত্রীর আয়কর নথিতে রয়েছে।’
নথিপত্র দেখানোর আশ্বাস ও সটকে পড়ার চেষ্টা: সরকারি চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় কেউ ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন কি না এবং এই ব্যবসা করার জন্য অধিদপ্তর থেকে কোনো বৈধ অনুমতি নেয়া হয়েছিল কি না—জানতে চাইলে তিনি সব কাগজপত্র দেখানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে তার জমা দেয়া আয়কর নথির তথ্যের বড় ধরনের গরমিল ও অসংগতি পাওয়ার বিষয়টির কথা জানালে তিনি পুনরায় নথিপত্র দেখাবেন বলে আশ্বস্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি।
উত্তরার বাসা কিংবা যেকোনো সুবিধাজনক স্থানে সাক্ষাৎ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তিনি আর যোগাযোগ করেননি। সর্বশেষ তিনি জানান, তার শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় দেখা করা সম্ভব হচ্ছে না এবং পরবর্তী সপ্তাহে সব কাগজপত্র দেবেন। কিন্তু এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি আর কোনো নথিপত্র প্রদান করেননি।




Comments