জীবনযাপনের, জীবনধারণের এবং জীবন সাজানোর বেশির ভাগ উপাদানের নিরবচ্ছিন্ন যোগানদার হলো প্রকৃতি। প্রকৃতি আমাদের কী না দেয়! খাদ্য, ফলমূল থেকে শুরু করে ওষুধ, পথ্য, পানীয়, কাপড়, বাড়িঘর নির্মাণের উপাদান প্রকৃতি থেকে আসে। কোটি কোটি মানুষের শ্বাস নেয়ার জন্য অক্সিজেন যোগান দেয়া, জীবন-জীবিকার উপায় সৃষ্টি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা পালন— সবকিছুই প্রকৃতির অবদান।
যে প্রকৃতি বারবার আমাদের রক্ষা করছে, তাকে রক্ষা করতে আমরা কি যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পেরেছি? মানুষের প্রতিদিনের জীবনধারায় পরিবেশবিরোধী কার্যকলাপের ফলে সৃষ্ট দূষণে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণ-প্রকৃতির বিলুপ্তি ঘটছে, হারিয়ে যাচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য। আজ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, প্রবাল প্রাচীর, জলাভূমি ধ্বংসের মুখে, নদী আর সাগর তীব্র দূষণের কবলে, প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করে গড়ে উঠছে আবাদি ভূমি, ঘটছে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ণ। আর এসবের মূল কারণ হিসেবে রয়েছে আমাদের ভোগবাদী আচরণ, প্রাকৃতিক সম্পদের অতি আরোহণ এবং সীমাহীন লোভ। বিদ্যমান রৈখিক অর্থনৈতিক মডেল আমাদের এগিয়ে দিচ্ছে একধরনের অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে, যাকে অন্তত টেকসই বলা চলে না।
এমন প্রেক্ষাপটে আজ ২৮ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীববৈচিত্র্য এখন মহা বিলুপ্তির দোরগোড়ায়, যার ফল আমাদের সবাইকেই ভোগ করতে হবে। যদি আমাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকনির্দেশনাকে পুনর্মূল্যায়ন করে পরিবেশবান্ধব আকারে আনা যায়, তবে আমরা আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে দেশ আর জীবজগেক বাঁচানোর আশা করতে পারি।
আইপিবিইএসের (IPBES) বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৮০ লাখ উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশেও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। আইইউসিএন বাংলাদেশের রেড লিস্ট অনুযায়ী, ১,৬১৯টি প্রাণী প্রজাতির সংরক্ষণ অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রজাতি বিলুপ্তি বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
আবার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী ১ দশমিক ৪ শতাংশ বনাঞ্চল হারিয়ে গেছে যে হার বাংলাদেশে ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এই প্রতিবেদনে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অতি আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়া এবং আগ্রাসী প্রজাতির দ্রুত বিস্তার।
পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশের জন্য ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন এবং সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা অনুসারে সেখানে অনুদানের ঘাটতি রয়েছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি এখন স্পষ্ট যে জীববৈচিত্র্য ক্ষতির পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্যও লাভজনক। নিম্ন-মধ্যম আয়ের একটি জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নের বিষয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। নীতি, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোগুলো এবং সব ক্ষেত্রের কর্মপরিকল্পনাগুলো একযোগে প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়ের রোধে সমন্বয় করা প্রয়োজন।




Comments