Image description

ময়মনসিংহ নগরীতে অপরাধ, যানজট ও অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা। কোনভাবেই লাগাম টানতে পারছে না সিটি কর্পোরেশন। সড়ক, মহাসড়ক ও অলিগলিতে এখন আতংকের আরেক নাম এসব অটোরিকশা।  চলাচলের নিয়মনীতি থাকলেও তা মানছে না এই অটোরিকশার মালিক ও চালকরা। 

অবৈধ এই যানের আবার গড়ে উঠেছে বৈধ অটোরিকশা মালিক ও শ্রমিক সংগঠন। অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই এসব সংগঠনের কাছে বরাবর অসহায়ত্ব বরণ করছে সিটি কর্পোরেশন ও প্রশাসন।  শুধু প্রশাসনই নয়, ব্যাটারি অটোরিকশার কাছে জিম্মি যাত্রীরা। হুটহাট যুক্তি বেঁধে দিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হয় যাত্রীদের কাছ থেকে। অনেকটা চাঁদাবাজির মত আচরণ করেন চালকরা। সবকিছু জেনেও নিশ্চুপ প্রশাসন। লোক দেখানোর অভিযান পরিচালনা করে কোনো রকমের দায়িত্ব পালন করেন তারা। শহরে যাত্রীর তুলনায় অটোরিকশার সংখ্যা এখন বেশি। 

সড়কে অটোরিকশা দৌরাত্ম্য কমাতে লাল ও সবুজ রংয়ে ভাগ করা হয় ব্যাটারী চালিত অটোরিকশা গুলোকে। পাঁচ ব্যাটারির লাল অটোরিকশা ও  তিন ব্যাটারীর হলুদ অটোরিকশা (মিশুক) চলবে বিজোড় তারিখে এবং সবুজ রংয়ের পাঁচ ব্যাটারী অটোরিকশা ও আকাশী রংয়ের তিন ব্যাটারি অটোরিকশা (মিশুক) চলবে জোড় তারিখে। সেই সাথে চিকন চাকার ব্যাটারি চালিত রিকশা চলবে সব তারিখে। আবার শহরে যানজট কমাতে এলাকা ভাগ করে দেয়া হয় কোন অটোরিকশা কোন এলাকা পর্যন্ত চলবে। নিয়ম থাকলেও এসব নিয়ম মানতে নারাজ অটোরিকশা মালিক ও চালকরা। শহরে প্রবেশ করছে সব ধরনের অটোরিকশা।  দেখা দিচ্ছে বিশৃঙ্খলা।  তবুও নেই এর বিরুদ্ধে তদারকি। 

মসিকের তথ্য : নগরীতে সড়কে তিন ধরনের অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে চিকন চাকার রিকশা ৫ হাজার ৪০০, মোটা চাকার মিশুক হিসেবে পরিচিত অটোরিকশা ৫ হাজার ৫৭১টি এবং লম্বা অটোরিকশা রয়েছে ৫ হাজার ৯৬৮টি। তবে অনুমোদনহীন অটোরিকশা প্রায় চারগুণ বেশি চলাচল করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এছাড়া জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ৪৫ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে।

ব্রীজ মোড় এলাকার যাত্রী মোতাহার হোসেন জানান, প্রথম যখন এই অটোরিকশা বের হয় তখন যাত্রীদের জন্য আশির্বাদ ছিলো। এখন এই অটোরিকশা অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছে। রিকশা ভাড়া যেখানে ৮০ টাকা নিত সেখানে অটোরিকশা দিয়ে মাত্র ১০ টাকা দিয়ে গন্তব্য পৌছানো যেত। কিন্তু এখন অনেক অটোরিকশা শহরে। যাত্রীর তুলনায় বেশি হয়ে গেছে। তারপরও অটোরিকশা চালকরা বেশি ভাড়ার আশায় গাড়িতে পাঁচ জনের জায়গায় নিচ্ছে আটজন করে। চালক কোনরকমে বসে ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালায়। আমরা কিছু বললে চালকরা আমাদের সাথে খারাপ আচরন করে। এমনকি মাঝ পথেও আমাদের নামিয়ে দেয় কিছু বললে।

সম্প্রতি এই অটোরিকশা হয়ে উঠেছে অপরাধের অন্যতম মাধ্যম। যাত্রীবেশে অটোরিকশাতে বসে থাকে ছিনতাইকারীরা। যখন নীরব স্থানে যায় তখন গাড়ী থামিয়ে দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কেড়ে নেওয়া হয় টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। ১০ জুলাই দিনে-দুপুরে আকুয়া ফিরোজ লাইব্রেরি এলাকায় অটোরিকশাতে যাত্রীবেশে থাকা ছিনতাইকারীরা দেশীয় অস্ত্র ঠেঁকিয়ে মানিকব্যাগ ও মোবাইল কেড়ে নেয় রাসেল নামে এক যুবকের। শহরের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিন ঘটছে এমন ঘটনা। তবুও নেই প্রতিকার।  চালককে হত্যা করে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।

ময়মনসিংহে বিভিন্ন চাকরী ও শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকালীন বৃষ্টি হলেই অটোরিকশা ভাড়া বেড়ে যায় চারগুণ। ১০ টাকার ভাড়া হয়ে যায় ৫০ টাকা। প্রতিবাদ করলেই হেনস্তার শিকার হতে হয় যাত্রীদের। সিটি কর্পোরেশন থেকে ভাড়া নির্ধারণ করা থাকলেও মানেনা চালকরা। যাত্রীদের অসহায়ত্বকে পুজি করে একপ্রকার চাঁদাবাজি করে চালকরা। সব কিছু জানার পরও নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা। রেবেকা ইয়াসমিন নামে এক যাত্রী জানান, দুরত্ব কম হলেও অটোরিকশাতে উঠলেই দিতে হয় দশটাকা। ব্রীজ থেকে টাউনহল পর্যন্ত গেলে ১০ টাকা, আবার ব্রীজ থেকে তাজমহল গেলেও ১০ টাকা। যেখানে দুরত্ব অনেক কম। ভাড়া বেশি দিলেও যেতে হয় গাদাগাদি করে।

সমাজ রূপান্তর সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন জানান, শহরে একপ্রকার অরাজকতা চালিয়ে যাচ্ছে অটোরিকশা।  সব জেনেও হাত গুটিয়ে বসে আছে যাদের এসব দেখভাল করা কথা। সকাল নয়টা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত অফিস টাইম শেষ হলে বেপরোয়া হয়ে উঠে অটোরিকশা।  চালকরা জানে অফিস সময় পাড় হবার পর পুলিশ বা সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা থাকবে না সড়কে। কোন রকম প্রশিক্ষণ না নিয়েই গাড়ী কিনেই সড়কে নেমে পড়ছেন চালকরা। শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে অটোরিকশা।  ঘটছে দুর্ঘটনা।  গত মঙ্গলবার শহরের শম্ভুগঞ্জ এলাকায় চালকের অদক্ষতার কারণে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ গেছে তিন যাত্রীর। 

শুধু প্রাণ নয়, প্রতিদিন এই অটোরিকশার কারনে অনেকে বরণ করছে পঙ্গুত্ব। মিশুক অটোরিকশা গুলো পর্দা লাগিয়ে চালাচ্ছে নিজেদের খেয়াল খুশি মত। এর আড়ালে চলছে বিভিন্ন অপরাধ। সামনে দিচ্ছে স্বচ্ছ পলিথিন। হর্নের বদলে লাগাছে ১০টাকা দামের খেলনার বাঁশি। যাত্রীদের জীবনকে এভাবেই খেলনা বানিয়ে খেলছে চালকরা। এত কিছু হবার পরেও কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না অটোরিকশা?  কার স্বার্থে এত পরিমান অটোরিকশা শহরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে?  এ প্রশ্নের উত্তর কি দিতে পারবে কর্তৃপক্ষ,  নাকি তারা নিজেরাই জানে না। 

লাইসেন্সের নামে অনুমোদন দিয়ে রাজস্ব বাড়ালেই হবে না। জনগনের নিরাপত্তার কথাও এখন থেকে ভাবতে হবে। এই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেই কমে আপরাধ, যানজট। নয়ত কাজের কাজ কিছুই হবে না। 

ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন জানান, যানজট নিয়ন্ত্রণে অটোরিকশা বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। নির্ধারিত তারিখে রংয়ের বাইরে অটোরিকশা শহরের ভিতর প্রবেশ করছে কিনা তা মনিটরিং করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে জব্দ করা হচ্ছে অটোরিকশা।  সড়কে অটোরিকশা শৃঙ্খলা ফেরাতে ইতোমধ্যে মালিক ও চালকদের সাথে আলোচনা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এর সুফল নগরবাসী অতি শীঘ্রই পাবেন।