সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন আজ ১৫ আগস্ট, শনিবার। ১৯৪৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে তাঁর জন্ম হয়। নদী মেখলা শাশ্বত বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ এক অনন্য দিন। জগতজুড়ে প্রলয়ংকরী ধ্বংস আর ধ্বংসাবশেষের ক্ষত-বিক্ষত চিহ্ন উৎকীর্ণ রেখে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিরত এই দিনে জন্ম হয়েছিল খালেদা খানম পুতুলের। ফেনীর ফুলগাজীর ইস্কান্দার মজুমদার ও দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী চন্দনবাড়ির তৈয়বা মজুমদার দম্পতির কোলজুড়ে নতুন ভোরের দীপ্তি নিয়ে আসেন তিনি। কাল-পরিক্রমায় বাবা-মায়ের আদরের সেই ‘পুতুল’ই বাংলাদেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও দেশপ্রেমের অন্যতম প্রতীক এবং জনগণের আস্থার অনিবার্য স্তম্ভ বেগম খালেদা জিয়া।
গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর পর এটিই তাঁর প্রথম জন্মদিন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তাঁর জানাজায় সর্বস্তরের লক্ষ লক্ষ মানুষের সজল-সকরুণ অংশগ্রহণ দেশের ইতিহাসে এক বিরল শোকগাথা হয়ে আছে।
রাজনৈতিক জীবন ও অর্জন
১৯৯১ সাল থেকে খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি প্রাথমিক সদস্যপদ লাভের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আড়াই বছরের মধ্যে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং টানা ৪১ বছর এ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়।
বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন মনোনীত হন। একই বছরের ১০ মে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কখনো কোনো নির্বাচনে হারেননি। ১৯৯১ সালে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তিনি ২৯ নম্বরে ছিলেন। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে তিনি একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা এবং গৃহবধূ থেকে উঠে আসা এক সফল শাসক ও রাজপথে প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হন।
ব্যক্তিগত জীবন ও শৈশব
পৈতৃক নিবাস ফেনীর ফুলগাজী হলেও খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে দিনাজপুরে। পাঁচ বছর বয়সে তিনি দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি হন এবং পরবর্তীকালে দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর ১৯৬৩ সালে দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সুদর্শন সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি দুই ছেলেসহ পাক সেনাদের হাতে বন্দী হন এবং ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি পান। এই দম্পতির দুই সন্তান—তারেক রহমান (জন্ম ১৯৬৫) ও আরাফাত রহমান কোকো (জন্ম ১৯৬৯)।
সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সরকার
বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের হাতে দেশের মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুভার তুলে দিয়েছেন। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি অভাবনীয় ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। বর্তমানে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। বেগম জিয়ার দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতার সময়ে তারেক রহমান লন্ডন থেকে দলকে তৃণমূল শক্তিতে রূপান্তরিত করে শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে এক বিরল ইতিহাস রচনা করেছেন। ২০ বছর পর জনগণের বিপুল সমর্থনে গঠিত জনবান্ধব সরকার বর্তমানে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানকে ধারণ করে কাজ করে যাচ্ছে।
জন্মদিনের কর্মসূচি
খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে বিস্তারিত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আজ বেলা ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া দেশব্যাপী বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য উপাসনালয়েও প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।
বিকেল ৩টায় রাজধানীর মহাখালী কড়াইল এলাকার টিঅ্যান্ডটি মাঠের দোয়া মাহফিল ও দরিদ্র-অসহায়দের মধ্যে অনুদান বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নাক্ষত্রিক বিভায় উদ্ভাসিত এই মহান নেত্রীর অনুপস্থিতিতে তাঁর প্রথম জন্মদিনে দেশবাসী তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে।
ডিআর




Comments