Image description

আমি দীর্ঘ সাড়ে চার বছর ইরান থেকেছি। অবরোধে হাফিয়ে ওঠা একটা দেশের মানুষের হাহাকার আমি দেখেছি। দেখেছি অবরোধের সাথে সংগ্রাম করে মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়াস। সাথে দেখেছি শিক্ষা-সাংস্কৃতির সাথে কোন কম্প্রমাইজ না করা একটা জাতিকে। ইরানের প্রধান উৎসব কিন্তু ঈদ না, ঈদ কেবলমাত্র সরকারি ছুটির দিন তাদের কাছে। ইরানের প্রধান উৎসব হলো নওরোজ যা জরথুস্ত্রবাদের সম্পৃক্ত একটা উৎসব এবং ইরানি নববর্ষের প্রথম দিন।

কিন্তু, নওরোজ পালনের সময়ও তারা ইসলামকে ফোকাস করে এবং যে ৭ টা জিনিস তারা নওরোজের সময় প্রদর্শন করে প্রতিটা বাড়িতে বাড়িতে তার ভেতর সবার আগে থাকে কোরআন। তারা নওরোজের সময়ও তারা একে অন্যের জন্য মন ভরে দোয়া করে নতুন বছর শুরু করে। ইরানের অধিকাংশ মানুষকে ইংরেজি তারিখ বা মাস জিজ্ঞেস করলে হা করে চেয়ে থাকবে।

তাদের প্রয়োজন হয় না ইংরেজি বছর অনুসরণ করার। যাইহোক, এতো অবরোধের ভেতরও চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশ্বে কেউ টেক্কা দিতে পারবে না ইরানকে। ইরানের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আছে ওয়ার্ল্ড র‍্যাংকিং-এ। ইরানের ধর্মচর্চার জন্যও অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর আজানও শোনা যায় না। কেউ কাউকে ধর্ম নিয়ে কোন কটূক্তি, কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা, দাওয়াত দেওয়ার জন্য ধর্মীয় গ্রুপ কিংবা প্রেসার দিতে পলিটিক্যাল গ্রুপ কিছুই নেই তাদের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। মেয়ে বাচ্চারা ভার্সিটির বাইরে হিজাব পড়লেও ভেতরে খুব বেশি একটা তোয়াক্কা করে না। আবার সেখানে ধর্মীয় ছাত্র রাজনীতির একটা সরকারি দল আছে যার নাম "বাসিজ"। কিন্তু, বাসিজ কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর রাজনীতি করার কোন অনুমতি পায় না। অর্থ্যাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম চর্চা, রাজনৈতিক চর্চা ব্যক্তিগত পর্যায়ের বাইরে অনুমোদিত নয়। 

ইরান থেকে ৪০০০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি হচ্ছে? এখানে লেখাপড়ার সাথে চেতনা জড়িত। কেউ ৪৭'র, কেউ ৭১'র কেউবা ২৪'র চেতনা, রাজনৈতিক চেতনা অথবা কেউ ধর্মীয় চেতনা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভরে ফেলেছে। চেতনা থাকবেই, কিন্তু, তা নিয়ে মারামারি কেবল আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেই হয়। অমুক জেলা সমিতি, তমুক জেলা সমিতি, অমুক সংগঠন, তমুক সংগঠন সবকিছুর কার্যক্রম হয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। হয় না খালি লেখাপড়া। আমরা বা আমাদের আগের প্রজন্ম ভার্সিটিতে লেখাপড়া করতে গেলেও ছাত্রনেতাদের উৎপাত, জ্বালাতন সহ্য করেছি। ২৪'র পর তাও এই উৎপাত কমেছে কিছুটা। কিন্তু, তারপরও আমরাতো চেতনার বাঙালী। চেতনা দিয়ে নিজেদের ভেতর গ্রুপিং করে কিছুতো করতে হবে। কাজতো নাই ছাত্রদের। আজ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলাপাইন মারামারি করলো, "নোবেল রবীন্দ্রনাথ নাকি নজরুলের প্রাপ্য তা নিয়ে।" চিন্তা করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পোলাপাইনদের অবক্ষয় কোন পর্যায়ে গিয়েছে! 

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতর দেখবেন অলিখিত প্রতিযোগিতা রয়েছে। সেই প্রতিযোগিতা হলো কার ক্যাম্পাস কতোটা সুন্দর, কাদের মাসিক/বাৎসরিক/বিভিন্ন ফিস্টের খাবার ভালো, কার হলে কে কতোটা সুযোগ সুবিধা পায়, কার স্বাধীনতা বেশি তার উপর৷ অথচ, কার ল্যাব ভালো, কারা গবেষণা বেশি করছে, কাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ভালো, কার পাবলিকেশন বেশি, রিসার্চ ভালো এবিষয় নিয়ে কোন প্রতিযোগিতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বাচ্চাদেরকে চাকরি নিয়ে ভাবতে হয় কেবল উপমহাদেশের দেশগুলোতেই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে একটা বাচ্চা চাকরির জন্য পথে-ঘাটে ঘুরতে হয় কেবল এই দেশগুলোতে। বাচ্চাদের পার্সোনাল স্কিল, স্মার্টনেস, আই-কিউ, ক্যারিয়ার নিয়ে কোন দিক নির্দেশনামূলক ক্লাস নেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কোন দাদা একবার নোট কইরা থুইয়া গেছিলো সেই ৩০/৪০ বছর আগে তা ফটোকপি করতে করতে এক লাইন পড়া গেলে পরের লাইন ধারণা কইরা নিতে হয়, ফটোকপি করতে করতে হলুদ হইয়া গ্যাছে। কি আজব, সেই নোট পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলাপাইন ৩০-৪০ বছর পরও পড়ে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাচ্চাদের মারামারি করার মতো এতো সময় থাকবে কেন? তাদের কারিকুলাম কেন হাজার বছরে পরিবর্তন হয় না, উন্নত হয় না? দেশের সবচেয়ে মেধাবী এবং ভদ্র বাচ্চারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হয়ে মারামারি করে বেড়াচ্ছে। বহির্বিশ্বে এধরণের কথা শুনলেওতো মানুষ হাসাহাসি করবে। 

কিন্তু, দায়ী কে, দায়ী কারা? বাচ্চাদেরকে নিয়ে সমালোচনা করার আগে নিজেদের গায়ের দিকে তাকালে দেখা যাবে আমরা বা আমাদের আগের-পরের সবাই এরকমই করে গেছে।

বাংলাদেশে কি শিক্ষাবিদের অভাব? কারিকুলাম পরিবর্তন বা বাচ্চাদেরকে যোগ্য করে গড়ে তোলার কোন ব্যবস্থা কি কখনো করা হবে না? বিসিএস'র বই লিইখা অনেকেই আজকাল নিজেদেরকে শিক্ষাবিদ দাবি করেন৷ আবার সেসব শিক্ষাবিদের কেউ কেউ আবার তাদের ব্যাপক সংখ্যক অনুসারীদের মাঝে অমুক-তমুকের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে, প্ররোচিত করে বাচ্চাদের ভেতর বিভেদও সৃষ্টি করে যাচ্ছেন অনায়াসে। এরকম বিভিন্ন শিক্ষাবিদের অনুসারীরা আবার সোস্যাল মিডিয়াতে এক দল আরেক দলকে আক্রমণ করে কি নোংরা ভাষায়!

কতো সংগ্রাম, কতো যোগ্যতা, কতো মেধার পরিচয় দিয়ে একটা বাচ্চা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকে। বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করেও বেকারত্বের ঘানি টানতে হয় তাদেরকে। এই দায়ভার কার? আমি বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে সেই দায়ভার কাকে দেবো? ওই বাচ্চাদেরকে, নাকি বাচ্চাদের বাংলাদেশে মেধাবী হয়ে জন্মানোর হতভাগ্যকে?

লেখক: ওয়ালিদ ইসলাম, পররাষ্ট্র ক্যাডার
এমআর