Image description

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ৫টি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যার মধ্যে রয়েছে— রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের রোডম্যাপ তৈরি, মিয়ানমারে সহিংসতা বন্ধ, পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিতকরণ, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক পার্শ্ব বৈঠকে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এই প্রস্তাবগুলো পেশ করেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ একাধিক অংশীদার দেশ ও সংস্থা সহ-আয়োজক হিসেবে অংশ নেয়।

উচ্চপর্যায়ের ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘‘এই সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই নিহিত।’’

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় নতুন করে উদ্বাস্তু মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিচ্ছে, যার ফলে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রতিবছর নতুন প্রজন্ম যুক্ত হয়ে সংকট আরও ঘনীভূত করছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম প্রস্তাবে, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

দ্বিতীয় প্রস্তাবে, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের সাধারণ বেসামরিক মানুষের ওপর সব ধরনের সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করা এবং রোহিঙ্গাদের মৌলিক মানবাধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর মতে, নিজভূমিতে সার্বিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত হলেই কেবল রোহিঙ্গাদের মনে ফিরে যাওয়ার আস্থা তৈরি হবে।

তৃতীয় প্রস্তাবে, মানবিক দিক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও পর্যাপ্ত ও অব্যাহত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, সংকট বৃদ্ধির সাথে সাথে আর্থিক সহায়তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তার আবেদন করা হলেও ২০২৬ সালে তা কমে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।

চতুর্থ প্রস্তাবে, টেকসই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার স্বার্থে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থাগুলোকে ধারাবাহিক সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মিয়ানমারে সংঘটিত গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ীদের আইনি জবাবদিহির আওতায় আনার তাগিদ দেন।

সবশেষ পঞ্চম প্রস্তাবে, সীমান্ত অপরাধ দমনে জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মাদকপাচার, মানবপাচার, অনলাইন ও ডিজিটাল প্রতারণা এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানসহ বিভিন্ন আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবিক কষ্টে দিনাতিপাত করুক। উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে তাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সর্বাত্মক সহায়তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বি-পাক্ষিক বৈঠকেও প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকেই এই সংকটের একমাত্র ও স্থায়ী সমাধান হিসেবে পুনর্ব্যক্ত করেন।

ডিআর