Image description

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রশ্নই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—‘দিল্লি কী চায়?’ বিশেষ করে বিগত বছরগুলোতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে, দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন ইস্যুতে এই প্রশ্নটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। তবে পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্নটি এখন নতুনভাবে তোলার সময় এসেছে—‘দিল্লি কী চায়’ নয়, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ঢাকা কী অর্জন করতে চায়?

কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, জনগণের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের মর্যাদা নিশ্চিত করা। সে বিবেচনায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা কোনোভাবেই একতরফা নির্ভরতার ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, সমতা, ন্যায্যতা ও বাস্তব স্বার্থের ভিত্তিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি সীমান্ত। সীমান্তে প্রাণহানি, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ—এমন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বক্তব্য নিয়মিত এলেও সীমান্তে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সেই বন্ধুত্বের বাস্তব সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাংলাদেশের প্রত্যাশা হওয়া উচিত সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। সীমান্ত সমস্যার সমাধান হতে হবে মানবিক ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করে।

পানি বাংলাদেশের জন্য কেবল পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক ইস্যু নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, জীবিকা ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশ্ন বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টন প্রশ্নে একটি ন্যায়সংগত, টেকসই ও বাস্তবসম্মত সমাধান বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা।

ঢাকার কূটনৈতিক অগ্রাধিকারে তাই অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও ন্যায্য হিস্যা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে।

ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং বিশাল ভারতীয় বাজার বাংলাদেশের রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে।

বাংলাদেশের স্বার্থ হলো—দেশটি যেন শুধু ভারতীয় পণ্যের বাজারে পরিণত না হয়; বরং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য, পাটজাত পণ্যসহ অন্যান্য রপ্তানিপণ্য ভারতীয় বাজারে আরও কার্যকর প্রবেশাধিকার পায়।

শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, সীমান্ত বাণিজ্য সহজ করা এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়গুলো তাই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অগ্রাধিকার পাওয়া প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগর, ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল-ভুটান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সম্ভাবনা বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

ভারতের সঙ্গে সড়ক, রেল, নৌপথ ও বন্দরভিত্তিক যোগাযোগ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যেকোনো ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট বা বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাভ, নিরাপত্তা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

কানেক্টিভিটি হতে হবে পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে, যাতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে লাভবান হয়; কোনো দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পররাষ্ট্রনীতিতে কতটা ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব।

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক অংশীদার; যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার। জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে।

ফলে ঢাকার স্বার্থেই প্রয়োজন বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে।

বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত—ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেও অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করা এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সরকার পরিবর্তন হতে পারে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হতে পারে; কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দীর্ঘমেয়াদি।

তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, জনগণের পারস্পরিক স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্য।

বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আঞ্চলিক কূটনীতিতেও একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতায় ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যেন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত না হয়।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে গণমাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন ও কূটনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে ‘দিল্লি কী চায়’ প্রশ্নটি আলোচিত হয়েছে। ভারত কী ধরনের নিরাপত্তা, কানেক্টিভিটি, বাণিজ্য বা আঞ্চলিক সহযোগিতা চায়—তা জানা অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু তার পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ঢাকা কী চায়?

বাংলাদেশ কীভাবে সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, কীভাবে অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যা আদায় করবে, কীভাবে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশ বাড়াবে, কীভাবে কানেক্টিভিটির অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করবে এবং কীভাবে নিজের কৌশলগত ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখবে—এসব প্রশ্নই হওয়া উচিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় বন্ধুত্ব ও জাতীয় স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়। বরং একটি টেকসই বন্ধুত্বের ভিত্তিই হলো পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতি।

ঢাকার আলোচনার টেবিলে অগ্রাধিকার কী?

বাংলাদেশের জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট অগ্রাধিকার পেতে পারে—সীমান্তে নিরাপত্তা ও প্রাণহানি বন্ধ, অভিন্ন নদীর পানিতে ন্যায্য হিস্যা, বাণিজ্যে ভারসাম্য, বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, কানেক্টিভিটি থেকে ন্যায্য অর্থনৈতিক সুবিধা, আঞ্চলিক সহযোগিতায় সমান অংশীদারিত্ব এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করা।

এ ধরনের সম্পর্কই হতে পারে বাস্তব অর্থে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার সম্পর্ক।

বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা খুব পরিষ্কার—ঢাকা যেন কোনো দেশের চাহিদার তালিকা নিয়ে আলোচনার টেবিলে না বসে; বরং বাংলাদেশের জনগণের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় মর্যাদা সামনে রেখে আলোচনায় অংশ নেয়।

বন্ধুত্ব থাকবে—কিন্তু মর্যাদার সঙ্গে।
সহযোগিতা হবে—কিন্তু সমতার ভিত্তিতে।
সম্পর্ক থাকবে—কিন্তু জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখে।

তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হওয়া উচিত আর শুধু ‘দিল্লি কী চায়?’ নয়।

বরং প্রশ্নটি এখন আরও স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন

‘বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে ঢাকা কী অর্জন করতে চায়?’

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কতটা ভারসাম্যপূর্ণ, টেকসই ও জনগণকেন্দ্রিক হবে।