Image description

‘শিক্ষা’ গোটা মানবজাতির ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার। তবে এটি একদিনে আবিষ্কৃত হয়নি। সেই প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুর মতো বাড়তে বাড়তে আজকে তার এই পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেছে। তাই যুগে যুগে মানবসমাজের চাহিদার আলোকে শিক্ষার ধারণায় এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষাব্যবস্থায় এমনই একটা যুগান্তকারী ও শক্তিশালী ধারণা হলো ‘একীভূত শিক্ষা’। একীভূত শিক্ষার মূল বার্তা হলো সব শিশুই শিক্ষার সমান অধিকার প্রাপ্ত হবে। এখানে কোনো শ্রেণি বৈষম্য থাকবে না। সংক্ষেপে, একটি বৈষম্যহীন সমাজ, রাষ্ট্র বা পৃথিবী বিনির্মাণের একটা বৈশ্বিক আন্দোলন হচ্ছে এই একীভূত শিক্ষার ধারণা।

একীভূত শিক্ষা এমন এক ধরনের শিক্ষা যার মাধ্যমে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের তাড়নায় শ্রেণি, জাতি, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, মেধা, শারীরিক বিকলাঙ্গতা, ধনী, গরিব ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় না নিয়ে একীভূত চেতনায় সমতার ভিত্তিতে সব শিশুকে উদার মানবীয় আদর্শে উজ্জীবিত করা হয়। এর মূল স্লোগান হচ্ছে - "All For Child, Child For All". এখানে সমাজের সব শিশুকেই শিক্ষার হকদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একীভূত শিক্ষার (Inclusive Education) ধারণাটি সর্বপ্রথম প্রবর্তিত হয় ১৯৯৪ সালে স্পেনের সালামাংকা শহরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ‘মা ও শিশুর শিক্ষা ও অধিকার’ শীর্ষক সম্মেলনে। পরে জাতিসংঘের ডাকার সম্মেলন-২০১০ এChild Friendly Teaching Learning Environment এর মূল ধারণা নিয়ে বিশ্বব্যাপী একীভূত শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে জাতিসংঘের Declaration of Human Rights -২০১০ এবং Convention on the Children Rights -২০১২ এর আলোকে সারা পৃথিবীতে একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

একীভূত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের পূর্বে পৃথিবীতে শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক বৈষম্য ছিল। সমাজের সব ধরনের শিশু শিক্ষা অর্জনের সমান সুযোগ পেতো না। একই বিদ্যালয়ে, একই পরিবেশে, একই শিক্ষকের কাছে সব শিশু শিক্ষা লাভ করতে পারতো না। সমাজ ভিন্ন ভিন্ন মেধা ও শ্রেণির শিশুর প্রতি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতো। বিশেষ করে সমাজের পিছিয়ে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতো। তাদেরকে সমাজের সচ্ছল শ্রেণির শিশুদের সাথে মিশতে দিতো না। এতে করে সমাজে সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতো না। তাছাড়া, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে মূলধারার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলো মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সমাজের এসব পিছিয়ে পড়া শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার নিমিত্তে  ইউরোপের দেশ নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্ক ৫০ এর দশকে সর্বপ্রথম সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। এদের দেখাদেখি ৮০র দশকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা একীভূত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে। এভাবে ধীরে ধীরে সব উন্নত দেশই একীভূত শিক্ষার চমকপ্রদ এই ধারণাটি গ্রহণ করে।

একীভূত শিক্ষার এই ধারণাটি বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বাংলাদেশেও এর ঢেউ আছড়ে পড়ে। বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫, ১৭, ১৯, ২৮ ও ২৯ একীভূত শিক্ষার ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করে কারণ এই অনুচ্ছেদগুলো বাংলাদেশের সব নাগরিকের মৌলিক অধিকার, শিক্ষা ও সুযোগের সমতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। অনুচ্ছেদ ১৭ প্রতিপালনের জন্য ১৯৯০ সালে দেশের ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন জারি করা হয় যা একীভূত শিক্ষার মূল দর্শন ‘সবার জন্য শিক্ষা’কে সমর্থন করে। ১৯৯২ সালের ১ জানুয়ারি প্রাথমিক পর্যায়ে ৬৮টি  উপজেলায় এবং ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি সারাদেশে এই আইন কার্যকর করা হয়। এই আইনকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য সরকার ১৯৯২ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে সবার জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হিসেবে ঘোষণা করে। এরপরে আরো তিন দশক পেরিয়ে গেছে কিন্তু বাংলাদেশের সকল শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। যেসব শিশু এখনও শিক্ষার আওতায় আসেনি তাদের বেশিরভাগই প্রতিবন্ধী ও ছিন্নমূল।

সরকার এসব শিশুকে দেশের মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জাতীয় শিক্ষানীতি -২০১০ কে একীভূত শিক্ষার আলোকে প্রণয়ন করে। এখানে প্রতিবন্ধী শিশু, আদিবাসী শিশু, পথশিশু, পরিত্যক্ত শিশু, পরিচয় বিহীন শিশু, শরণার্থী শিশুসহ সবাইকে একই শ্রেণিকক্ষে একই মানের শিক্ষা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি -২০১০ এর আলোকে জাতীয় শিক্ষাক্রম -২০২২ কেও একীভূত শিক্ষার চেতনায় সজ্জিত করা হয়েছে।  জাতীয় শিক্ষাক্রম -২০২২ এ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সকল শিশুকে শিক্ষার আওতায় আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে দেশের সব প্রতিবন্ধী শিশু, অসহায় শিশু ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য সময়মতো শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষাসহায়ক উপকরণ সরবরাহের কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও, বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশুদেরকে একীভূত শিক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে কিছু নীতি ও আইন প্রণয়ন করা হয়েছে যেমন: প্রতিবন্ধী বিষয়ক জাতীয় নীতিমালা -১৯৯৫, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন -২০০১, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন -২০১৩, নিউরো ডেভলপমেন্ট প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন -২০১৩ ইত্যাদি।

এতদসত্ত্বেও, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একীভূত শিক্ষার চেতনায় ঘাটতি দেখা যায়। এ প্রবণতা দেশের নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেশি দেখা যায়। সেসব প্রতিষ্ঠানে সমাজের সব শ্রেণির শিশুর জায়গা হয় না। কারণ, সেখানে বেতন বেশি হওয়ায় উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরাই কেবল পড়তে পারে। সমাজের অসহায়, ছিন্নমূল, দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী শিশুরা যথেষ্ট মেধা থাকা সত্ত্বেও সেসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারে না। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব জায়গাতেই এ ধরনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া, আমাদের সমাজে এখনও একীভূত শিক্ষার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান আছে। আমাদের অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের একাংশ এখনও সমাজের প্রতিবন্ধী, অসহায়, গরিব ও ছিন্নমূল শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় দেখতে চান না। তারা এসব শিশুদের ঘৃণা করেন এবং তাদের স্বাভাবিক শিখন-শেখানো কার্যক্রমে অসহযোগিতা করেন। এটা নিঃসন্দেহে এখানকার একীভূত শিক্ষার পথে বড় অন্তরায়।

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ সালে দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে ড. তারিখ আহসান ও ম. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া নামক দুজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক উল্লেখ করেছেন যে, ‘সারাবিশ্বে মাত্র ৫২ ভাগ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে মূলধারার বিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তবে বাংলাদেশে এ হার কোনোভাবেই ২৫ ভাগের বেশি নয়। অথচ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ৬০ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু সামান্য বা কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে। ২০ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু কিছুটা পরিবর্তন আনয়নের মাধ্যমে মূলধারার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করতে পারবে। শুধু ২০ শতাংশ উচ্চমাত্রার বা চরম প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে’। এ লেখা থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশে একীভূত শিক্ষার বাস্তব চিত্র খুব একটা ভালো নয়। এখানে একীভূত শিক্ষা নিয়ে অনেক কিছু করার এখনো বাকি আছে।

একীভূত শিক্ষার ইতিবাচক দিক অনেক। এটি একটি বৈষম্যহীন, উদার, মানবিক এবং ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখায়। এটি অভিভাবক, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে অবদান রাখে। সর্বোপরি, একীভূত শিক্ষা একটি দেশের জনশক্তির মানোন্নয়নে প্রভূত অবদান রাখে। তাই, একীভূত শিক্ষার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। আর সরকারকে এ বিষয়ে আরো বেশি আন্তরিক হতে হবে যাতে দেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের স্বকীয়তার নামে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত এই একীভূত শিক্ষার চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করতে না পারে।

লেখক: শিক্ষক, পাইকগাছা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, খুলনা

মানবকণ্ঠ/এসআরএস