খুলনা বিভাগ মূলত কৃষি ও পশুপালননির্ভর অঞ্চল। এই বিভাগের দশটি জেলার গ্রামাঞ্চলে গরু পালন কেবল একটি পেশা নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবন ও স্বপ্নের শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গরু চুরির ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। চুরির এই ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে যশোরের কেশবপুর উপজেলায় এক বিচিত্র ও নজিরবিহীন ঘটনার দেখা মিলেছে।
উপজেলার শাহপুর গ্রামের কবিরাজ ও খামারি উজির আলী নিজের একটি গরুর সুরক্ষায় গোয়ালঘরের দরজায় এক-দুটি নয়, বরং মোট ১২টি তালা লাগিয়েছেন। দরজার বাইরের হ্যাসপে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে ৮টি তালা এবং ভেতরের শাটারের নিরাপত্তায় রয়েছে আরও ৪টি তালা। গরু চুরির হাত থেকে বাঁচতে নেওয়া এমন নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন পুরো এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
উজির আলী জানান, গরু চুরি ঠেকাতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি বলেন, “গরু শুধু একটি পশু নয়, এটি আমার সংসারের একমাত্র ভরসা। অনেক কষ্ট করে গরুটিকে বড় করেছি। এক রাতে যদি এটি চুরি হয়ে যায়, তবে আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। অনেকে গরু বিক্রি করে সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেন, কেউ মেয়ের বিয়ের টাকা জমান, আবার কেউ চিকিৎসার স্বপ্ন দেখেন। সকালে উঠে গোয়ালঘর খালি দেখলে সেই সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে যায়।”
স্থানীয়রা জানান, কেশবপুর ও আশপাশের এলাকায় গরু চুরির ভয় এতটাই প্রকট যে, উজির আলীর এই ১২ তালা লাগানোকে তারা অস্বাভাবিক মনে করছেন না। অনেক কৃষক এখন চোরের ভয়ে রাতে নিজের ঘরে না ঘুমিয়ে গোয়ালঘরের ভেতর মশারি টাঙিয়ে গরুর পাশে রাত কাটাচ্ছেন। অনেকে ব্যবহার করছেন লোহার শিকল ও অতিরিক্ত তালা।
উজির আলীর এই ১২ তালার গোয়ালঘরের ছবি ও ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। নেটিজেনরা একে গ্রামীণ জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখছেন।
এ বিষয়ে কেশবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, “গরু চুরি রোধে পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। সন্দেহভাজন এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে এবং নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। জনগণ সচেতন হয়ে তথ্য দিলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি।” চুরির ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে থানায় জানানোর জন্য তিনি খামারিদের প্রতি আহ্বান জানান।
উজির আলীর ১২ তালার এই দরজাটি কেবল একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য নয়, এটি হাজারো কৃষকের শ্রম ও স্বপ্ন হারানোর ভয়ের এক জীবন্ত দলিল।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments