পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলায় চলতি মৌসুমে তরমুজের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হতাশা ।
তেতুলিয়ার পারের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে এ বছর তরমুজের ভালো ফলন হয়েছে। তবে উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দাম কমে গেছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে দশমিনা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তরমুজ সরবরাহ করতে গিয়ে কৃষকদের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যয় মেটাতে না পেরে তারা কম দামে তরমুজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে উৎপাদন খরচ ওঠানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
চরহাদির কৃষক সোহেল জানান, তিনি ৮ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। প্রতি একরে তার খরচ হয়েছে ১ লক্ষ থেকে - ১লাক্ষ ২০হাজার টাকা। মোট আট একরে খরচ হয়েছে প্রায় ৮-১০ লক্ষ টাকা। এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৫ লক্ষ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছেন। ক্ষেতে থাকা বাকি তরমুজ থেকে লাভের আশা করছেন না তিনি। ফলন ভালো হলেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় হতাশা বাড়ছে।
তিনি আরও জানান, আগে চরহাদি থেকে দশমিনা পর্যন্ত এক বোট তরমুজ পরিবহনে খরচ হতো ৭-৮ হাজার টাকা, যা এখন বেড়ে অতিরিক্ত ৩-৫ হাজার টাকা বেশি লাগছে। একইভাবে, তরমুজ পরিবহনের জন্য ট্রাক ভাড়া ২০-৩০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪০-৪৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় লাভের মুখ দেখছেন না তিনি।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে তেতুলিয়া নদীর চরে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমি চাষের আওতায় এসেছে। চরসামাদ, লালচর, চরআজমাইন, চরহাদী, কালিরচর, পূর্ব কালিরচর, ভাটারচর, পাতারচর, চর ত্রৈলোক্য, ভোলাইশিং, পাঁচখালী, চরবোরহান, চরশাহজালাল ও বেলচরসহ বিভিন্ন চরে এখন তরমুজের সমারোহ দেখা যাচ্ছে।
চরবোরহানের কৃষক জামাল মৃধা অভিযোগ করেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ না থাকায় কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে বাম্পার ফলন হওয়া সত্ত্বেও তাদের মুখে হাসি নেই।
কৃষকদের দাবি, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে পরিবহন খরচ কমানো, ন্যায্য বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং সরাসরি বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা হলে তারা ন্যায্য মূল্য পেতে পারেন। অন্যথায় ভবিষ্যতে অনেকেই তরমুজ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ জানান, চলতি মৌসুমে তরমুজের বাম্পার ফলন হওয়ায় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি হয়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে গেছে। এছাড়া পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষকদের খরচ বেড়েছে, যা বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য করনীয় কি প্রশ্নে মানবকন্ঠকে কৃষি কর্মকর্তা বলেন, পরিকল্পিত আবাদ ব্যবস্থা নিশ্চিত। সংরক্ষণ সুবিধা, সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা,সহজলভ্য পরিবহন ব্যবস্থা,কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও বাজার তথ্য প্রদান। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে কৃষকরা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়ে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারবেন।




Comments