একসময় গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে প্রকৃতি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ত, তখন গ্রামীণ জনপদে প্রশান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দিত সোনালি রঙের সোনালু ফুল। মাদারীপুরের শিবচরের গ্রামবাংলার মেঠো পথ, মাঠের ধার কিংবা বসতবাড়ির আঙিনায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালু গাছগুলো যেন ছিল প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। ঝরে পড়া হলুদ ফুলে তৈরি হতো প্রাকৃতিক কার্পেট। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে শিবচরের সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি। উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা ঘুরে এখন আর খুব একটা সোনালু গাছের দেখা মেলে না। স্থানীয়দের কাছে ‘বাঁদরলাঠি’ বা ‘বাদলের লাঠি’ হিসেবে পরিচিত এই গাছটি এখন বিলুপ্তির পথে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরায়ণ আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের কবলে পড়ে শিবচরের বন-বনানি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্যবর্ধক এই বৃক্ষটি। সোনালু ফুলের থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা সৌন্দর্য এখন আর মানুষের চোখে খুব একটা পড়ে না।
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, “আমাদের ছোটবেলায়ও দেখতাম রাস্তার দুই ধারে সোনালু গাছ ফুলে ফুলে ভরে থাকত। গ্রীষ্মের দুপুরে সেই হলুদ আভার সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করত। এখন গ্রাম ঘুরেও সোনালু গাছ খুব একটা চোখে পড়ে না।”
স্মৃতিচারণ করে সেলিনা আক্তার (৪৫) নামের এক গৃহিণী বলেন, “আমরা ছোটবেলায় এই গাছটাকে ‘বাঁদরলাঠি’ বলতাম। এর লম্বা লম্বা ফলগুলো নিয়ে খেলতাম, ফুল কুড়িয়ে মালা বানাতাম। এখনকার ছেলেমেয়েরা তো সোনালু গাছ চেনেও না। প্রকৃতির এই পরিবর্তন দেখে খুব আফসোস হয়।”
পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, বন উজাড় এবং মানুষের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের কারণে সোনালু গাছ আজ হুমকির মুখে। মানুষ এখন গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে ফলজ বা কাঠজাত গাছের প্রাধান্য বাড়লেও সোনালুর মতো সৌন্দর্যবর্ধক ও পরিবেশবান্ধব গাছগুলো অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।
সচেতন মহলের মতে, সোনালু শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এটি জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ ও মধু মৌমাছি এবং পরাগায়নকারী পতঙ্গদের আকৃষ্ট করে। সোনালু হারিয়ে যাওয়া মানে আমাদের বাস্তুসংস্থানের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
হারিয়ে যাওয়া এই সোনালি আভা ফিরিয়ে আনতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি প্রয়োজন। শিবচরের পথে-প্রান্তরে আবারও সোনালু বা ‘বাদলের লাঠি’র সোনালি মেলা ফিরে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা প্রকৃতিপ্রেমীদের।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments