পদ্মার বুকে অবহেলিত বার চর, অনিশ্চয়তায় কাটছে হাজারো মানুষের জীবন
কবির ভাষায় এ দেশ শস্য-শ্যামল ও নদীমাতৃক। কিন্তু সেই রূপের আড়ালেই লুকিয়ে আছে অবহেলা, বঞ্চনা আর চরম অনিশ্চয়তায় ঘেরা জীবনসংগ্রামের গল্প। এমনই এক জনপদ মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার চরজানাজাত ইউনিয়নের ‘বার চর’। পদ্মার বুকে জেগে ওঠা এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপে প্রতিটি সূর্যোদয় মানেই টিকে থাকার এক নতুন লড়াই।
শিবচর উপজেলা সদর থেকে বার চরের দূরত্ব মাত্র ১৪ কিলোমিটার। ভৌগোলিক দূরত্ব কম মনে হলেও উন্নয়নের মাপকাঠিতে এই জনপদ যেন মূল ভূখণ্ড থেকে কয়েক যুগ পিছিয়ে। কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে পৌঁছাতে হয় স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বেপারী বাজার’ বা বার চরে। যাত্রাপথেই চোখে পড়ে নদীভাঙনের ক্ষত আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা মানুষের বিমর্ষ প্রতিচ্ছবি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বার চরের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। উর্বর জমি আর বিশাল নদী থাকলেও মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবে জীবন এখানে থমকে আছে। চরবাসীর প্রধান অভিযোগ—এখানে নেই বিদ্যুৎ, নেই উন্নত স্বাস্থ্যসেবা কিংবা মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা। সাধারণ জ্বর বা ডায়রিয়াও এখানে জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় জরুরি প্রয়োজনে মূল ভূখণ্ডের হাসপাতালে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা মজিদ বেপারী (৬০) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "আমাগো কষ্টের কথা কেডা শুনবো? অসুখ হইলে ডাক্তার নাই, হাসপাতাল নাই। কবিরাজই শেষ ভরসা। বিদ্যুৎ নাই, গরমে ঘরে থাকা যায় না। বাইরের দুনিয়ার খবরও ঠিকমতো পাই না।"
কৃষক জহিদ মুন্সি ও রানা বেপারী জানান, চরের মাটি সোনার মতো খাঁটি হলেও সেচের অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। কষ্ট করে ফসল ফলালেও যাতায়াত সংকটের কারণে বাজারে ন্যায্য দাম পান না তারা; লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগী মহাজনদের পকেটে।
দুই সন্তানের জননী আলেয়া বেগম বলেন, "চরের জীবন মানেই ভয় আর কষ্ট। বাচ্চারা অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। কিছু হলে শুধু আল্লাহর ভরসা।"
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে নৌযান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়লে কয়েকদিন পর্যন্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে এই জনপদ। ফলে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, "চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা সত্যিই চ্যালেঞ্জপূর্ণ। সরকার পর্যায়ক্রমে এসব এলাকায় যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে।"
মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দীন আহমেদ হানজালা বলেন, "চরজানাজাতের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করতে ইতোমধ্যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, সড়ক, বিদ্যুৎ, নদীভাঙন রোধ ও সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে।"
পদ্মার বুকে গড়ে ওঠা এই জনপদ কেবল একটি চর নয়, এটি উন্নয়নবঞ্চিত মানুষের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। চরের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, সরকারি প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হয়ে তাদের জীবনেও আসবে উন্নয়নের আলো।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments