কুষ্টিয়ায় সেনাবাহিনীর বাস ও যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৬০
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় সেনাসদস্য বহনকারী একটি বাসের সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ৬০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে প্রশিক্ষণরত সেনাসদস্য, সাধারণ যাত্রী ও বাসচালক-সহকারীরা রয়েছেন। দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আহতদের আর্তচিৎকারে পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে।
রোববার (৩১ মে) দুপুর ১২টার দিকে পাবনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কের মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া হাইস্কুলের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তি জিয়া নামে পরিচিত। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তিনি ব্র্যাক ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা ছিলেন এবং তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ঈদুল আজহার ছুটি শেষে প্রশিক্ষণরত সেনাসদস্যদের একটি দল ভাড়া করা বাসে করে বগুড়া থেকে খুলনার জাহানাবাদ সেনানিবাসে ফিরছিলেন। বাসটিতে মোট ৪২ জন সেনাসদস্য ছিলেন। একই সময়ে খুলনা থেকে কুষ্টিয়ার দিকে আসছিল হিমেল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস। তালবাড়িয়া এলাকায় পৌঁছালে দুই বাসের মধ্যে ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের তীব্রতায় উভয় বাসের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। দুর্ঘটনার শব্দ আশপাশের কয়েক কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর সড়কে ছিটকে পড়ে বাসের বিভিন্ন অংশ। অনেক যাত্রী বাসের ভেতরে আটকা পড়েন।
খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধারকাজে অংশ নেন। পরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে জিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের মধ্যে অন্তত ১০ জন সেনাসদস্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদের মধ্যে অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।
আহত সেনাসদস্যরা জানান, তারা সেনাবাহিনীর নতুন রিক্রুট হিসেবে প্রশিক্ষণরত রয়েছেন। ঈদের ছুটিতে নিজ নিজ বাড়িতে গিয়েছিলেন। ছুটি শেষে খুলনার জাহানাবাদ সেনানিবাসে ফেরার পথে তারা দুর্ঘটনার শিকার হন। সংঘর্ষের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। অনেকেই আঘাতের কারণে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার জসীম উদ্দীন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে যান এবং আহতদের খোঁজখবর নেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “প্রশিক্ষণরত নতুন সেনাসদস্যরা এই বাসে ছিলেন। দুর্ঘটনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কী কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত গতি কিংবা চালকের অসতর্কতার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
দুর্ঘটনার পর পাবনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কের ওই অংশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। পরে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতায় ক্ষতিগ্রস্ত বাস দুটি সরিয়ে নেওয়া হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, পাবনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কের এই অংশে প্রায়ই বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচল করে। প্রয়োজনীয় নজরদারি ও গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তারা মহাসড়কে কঠোর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত জিয়ার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
ঈদকে সামনে রেখে দেশের মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এমন সময়ে কুষ্টিয়ার মিরপুরে সংঘটিত এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।




Comments