দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সম্পর্ক নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের সমুদ্রতীরবর্তী শহর আঁতিবে প্রথম দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে বসছেন দুই নেতা।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এটিই হতে যাচ্ছে ম্যাক্রোঁ ও মেলোনির প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক। ওই চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স-ইতালি সম্পর্ককে ফ্রান্স-জার্মানি সম্পর্কের সমপর্যায়ে উন্নীত করা হয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, বৈঠকে প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক জ্বালানি, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং অন্যান্য কৌশলগত খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হবে। ভূমধ্যসাগর উপকূলে অবস্থিত মনোরম ভিলা আইলেনরে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বৈঠকের আগে ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমাদের পরস্পরকে প্রয়োজন।” এই বক্তব্য থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে প্যারিসের আগ্রহ স্পষ্ট হয়েছে।
ইউরোপের মধ্যপন্থি নেতা ম্যাক্রোঁ এবং ডানপন্থি জোটের নেতা মেলোনির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ইস্যুতে মতবিরোধ রয়েছে। অভিবাসন, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নীতিগত প্রশ্নে তাদের অবস্থান এক নয়। তবুও গত বছরের জুনে রোমে অনুষ্ঠিত একান্ত বৈঠকের পর দুই নেতার সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হতে শুরু করে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে প্যারিসে আয়োজিত এক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে মেলোনি এলিসি প্রাসাদে পৌঁছালে ম্যাক্রোঁ তাকে স্বাগত জানান। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা আরও জোরালো হয়।
প্যারিসভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সায়েন্সেস পো-এর ইতালি বিশেষজ্ঞ মার্ক লাজারের মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ম্যাক্রোঁ ও মেলোনি সম্পর্ক উন্নয়নের সাম্প্রতিক ধারা এগিয়ে নিতে আগ্রহী।
তিনি বলেন, ইতালির প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন অবস্থানের সমালোচনা করায় ম্যাক্রোঁর সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও ইতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দুই নেতার মধ্যে কিছু বিষয়ে মিলও রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার মারকোসুর জোটের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা—এমন একটি বিষয়ে তাদের অবস্থান প্রায় একই।
তবে ইতালির প্রস্তাবিত অভিবাসী আটক কেন্দ্র স্থাপন, ইউক্রেনে সেনা পাঠানো এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো ইস্যুতে তাদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ে একটি রোডম্যাপ স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ইউক্রেনকে সরবরাহ করা যৌথ এসএএমপি/টি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
এ ছাড়া পারমাণবিক জ্বালানি খাতে নতুন সহযোগিতা চুক্তি এবং ইউরোপের নিজস্ব স্যাটেলাইট যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে আরেকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরেরও সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আঁতিবের এই শীর্ষ বৈঠক শুধু ম্যাক্রোঁ ও মেলোনির ব্যক্তিগত সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ই নয়, বরং ইউরোপের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ফ্রান্স ও ইতালির কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




Comments