জেলা শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো জামে মসজিদ আর তার পাশের কওমি মাদ্রাসাটি বহু বছরের সাক্ষী। ঈদের আনন্দ, বন্যার কান্না, শীতের কম্বল বিতরণ—সবই দেখেছে। কিন্তু ২০২৪ সালের সেই জুলাই ছিল অন্যরকম।
ভোর থেকে রাত পর্যন্ত শহরের বাতাসে ভেসে আসত মিছিলের স্লোগান। রাস্তা ভরে থাকত শিক্ষার্থী, শ্রমিক, দোকানদার, রিকশাচালক, শিক্ষক, বৃদ্ধ, তরুণ—নানান পেশা আর বয়সের মানুষের পদচারণায়। প্রচণ্ড রোদে মানুষের গলা শুকিয়ে যেত। তখন মসজিদের গ্রিলের ভেতর থেকে মুয়াজ্জিন আর খাদেম বালতি আর জগে করে যতটুকু পারতেন পানি এগিয়ে দিতেন। কেউ "আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন" বলে চলে যেত, কেউ শুধু এক চুমুক পানি খেয়ে নীরবে চোখ মুছত।
জামাতের নির্দিষ্ট সময় ছাড়া নিরাপত্তার জন্য গেট বন্ধই থাকত।
এক রাতে এশার নামাজের পর একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন ক্ষমতাসীন দলের জেলা সভাপতি। মাদ্রাসার বড় হুজুরের কক্ষে বসে কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি বললেন,
—হুজুর, আপনাদের অনেক কাজ আমরা করে দিই। মাদ্রাসার বিভিন্ন সময়ে সাহায্য-সহযোগিতা করি। নিরাপত্তার বিষয়টাও দেখি। তাই একটা অনুরোধ।
বড় হুজুর শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন।
—আগামীকাল থেকে যারা মিছিল করছে, তাদের কাউকে পানি দেওয়া যাবে না। কোনো সহযোগিতাও না। এতে আমাদের জন্যও সুবিধা হবে, আপনাদেরও।
কথাগুলো বলে তিনি বড় হুজুরের মুখের দিকে তাকালেন।
বড় হুজুর শুধু মৃদু হাসলেন।
না বললেন না।
হ্যাঁ-ও বললেন না।
অতিথি চলে গেলে তিনি অনেকক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। টেবিলের ওপর খোলা কুরআনের দিকে তাকিয়ে তাঁর ঠোঁটে নিঃশব্দে কিছু দোয়া ভেসে উঠল।
পরদিন ফজরের নামাজ শেষ হলো।
আকাশে তখনো সকালের নরম আলো।
মসজিদের উঠোন ঝাড়ু দিতে দিতে খাদেম দেখলেন, মুয়াজ্জিন গেটের তালার দিকে এগোচ্ছেন।
খাদেম ধীরে বললেন,
—ভাই, আজ তালা লাগাবেন না।
মুয়াজ্জিন অবাক হয়ে তাকালেন।
—কেন?
খাদেম শান্ত কণ্ঠে বললেন,
—বড় হুজুর রাতে কিছু বলেননি। কিন্তু ভোরে আমাকে শুধু একটি কথাই বলেছেন—"মজলুমদের পাশে থাকা ইবাদতের শামিল। মসজিদের কোনো দরজাই বন্ধ থাকবে না।"
মুয়াজ্জিন কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে তালাটা খুলে রেখে দিলেন।
মসজিদের সব দরজা খুলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন ক্লান্ত পথচারী ভেতরে ঢুকলেন। কেউ ওজুখানায় মুখে পানি দিলেন, কেউ ছায়ায় বসে একটু বিশ্রাম নিলেন। একজন বৃদ্ধ পথিক বললেন,
—আল্লাহর ঘরের দরজা খোলা থাকলে মানুষের মনেও আশা বেঁচে থাকে।
খাদেম বড় বড় কলসিতে নতুন করে পানি ভরলেন। মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রও এগিয়ে এল। তারা গ্লাস ধুয়ে রাখল, কেউ কলসি টেনে আনল, কেউ ক্লান্ত মানুষদের বসার জন্য চাটাই বিছিয়ে দিল।
সারা দিন ধরে মানুষ এল, পানি খেল, বিশ্রাম নিল, আবার চলে গেল।
বিকেলের দিকে বড় হুজুর উঠোনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি দেখলেন, এক কোণে এক বৃদ্ধ রিকশাচালক, আরেক পাশে কয়েকজন শিক্ষার্থী, অন্যদিকে এক শ্রমিক—সবাই একই কলসি থেকে পানি পান করছে।
তিনি ধীরে বললেন,
—আল্লাহর ঘর মানুষের জন্য। এখানে দান নয়, দয়া নয়—মানুষের প্রয়োজনের সময় মানবিকতা যেন কখনো বন্ধ না হয়।
মাগরিবের আজানের ধ্বনি শহরের কোলাহল ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
সেই দিনের কথা পরে অনেকে নানা ভাষায় বলেছে। কেউ রাজনৈতিক গল্প হিসেবে, কেউ মানবিকতার গল্প হিসেবে।
কিন্তু মসজিদের খাদেম যখনই সেই সকালটির কথা স্মরণ করেন, তাঁর মনে শুধু একটি বাক্যই ফিরে আসে,
"মজলুমদের পাশে থাকা ইবাদতের শামিল। মসজিদের কোনো দরজাই বন্ধ থাকবে না।"
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments