Image description

প্রতি বর্ষায় অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম ও এর উপকূলীয় অঞ্চল ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের মুখোমুখি হয়। মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া, পশ্চিম বাঁশখালী, আনোয়ারা, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম নগরীর ফিরিঙ্গীবাজার, আগ্রাবাদ, খুলশী, জিইসি, টাইগারপাস, হালিশহর, পতেঙ্গাসহ বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের পর বছর একই দুর্ভোগের শিকার। প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর একই সংকট কেন ফিরে আসে? সমস্যার প্রকৃত কারণ কোথায়, আর স্থায়ী সমাধানই বা কেন হচ্ছে না?

এর উত্তর জানতে হলে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, নদী-খাল, বেড়িবাঁধ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করতে হবে। এই সংকট কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি; বরং দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং জবাবদিহির অভাব—সব মিলিয়েই আজকের এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার মতো উপকূলীয় দ্বীপাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধের অভাব এবং পর্যাপ্ত স্লুইসগেট না থাকা। ফলে জোয়ারের পানি সহজেই লোকালয়ে প্রবেশ করে, আবার অতিবৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না। এসব এলাকায় আধুনিক ও দীর্ঘস্থায়ী বেড়িবাঁধ এবং কার্যকর স্লুইসগেট নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

চকরিয়া ও পেকুয়ার ক্ষেত্রে মগনামা ঘাট থেকে ছনুয়া পর্যন্ত উপকূলীয় অংশে শক্তিশালী বেড়িবাঁধের ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি মাতামুহুরী নদী ও সংযুক্ত খালগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না। প্রয়োজন নিয়মিত নদী ও খাল খনন, প্রশস্তকরণ এবং পানি নিয়ন্ত্রণে আধুনিক স্লুইসগেট স্থাপন। পশ্চিম বাঁশখালীর গন্ডামারা, পশ্চিম বাহারছড়া ও খানখানাবাদ থেকে প্রেমাশিয়া পর্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ। এসব এলাকা সরাসরি বঙ্গোপসাগরের মুখের ওপর অবস্থিত হওয়ায় এখানে টেকসই বেড়িবাঁধ ও স্লুইসগেট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বহুবার উঠে এসেছে। অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও অনেক কাজ এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে অথবা প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারেনি।

একই সঙ্গে বাহারছড়া, কাথরিয়া, বাংলাবাজার ও শেখেরখীল এলাকা সাঙ্গু নদীর সঙ্গে সংযুক্ত, আর সাঙ্গু নদী সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত। এ কারণে অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদীতে নেমে যাওয়ার জন্য অভ্যন্তরীণ খালগুলোর পুনঃখনন ও প্রশস্তকরণ জরুরি, পাশাপাশি এসব এলাকায় পর্যাপ্ত স্লুইসগেট নির্মাণও অত্যাবশ্যক।

উপকূলবর্তী আনোয়ারার অবস্থাও প্রায় একই রকম। বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর উপকূল সুরক্ষা অবকাঠামো এখনও সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়নি। তাই চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, গুণগত মান এবং কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন; এখানে টেকসই বেড়িবাঁধ নেই এবং স্লুইসগেটও নেই; এ যদি অবস্থা হয় তাহলে অতিবৃষ্টি বা সাগরের পানি বাড়লে মানুষ ডুবে না মরে বাঁচবে কীভাবে। এটি যেহেতু বঙ্গোপসাগরের সাথে, তাহলে স্লুইসগেট থাকলে পানি সাথে সাথে ভাটায় সাগরে নেমে যেত।

সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া অঞ্চলের বহু নদী ও খাল সাঙ্গু নদীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকলেও নাব্যতা কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়ক ও রেলপথও পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। প্রয়োজন নদী-খাল পুনঃখনন, সাঙ্গুর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং প্রয়োজনীয় স্থানে বক্স কালভার্ট, স্লুইসগেট ও অন্যান্য পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণ।

চট্টগ্রাম নগরীর সমস্যা আরও জটিল। একসময় যে খালগুলো শহরের প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করত, তার অনেকগুলো আজ দখল, ভরাট এবং ময়লা-আবর্জনায় ভরে গেছে। ফিরিঙ্গীবাজার খাল, বাকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর, ২নং গেট, আগ্রাবাদ, খুলশী, জিইসি, টাইগারপাস, হালিশহর, পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকার খালগুলো তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এত বড় একটি শহর, অথচ এখানে স্লুইসগেট বললেই চলে ফিরিঙ্গীবাজারের খালের কথা, আর একটি আছে হালিশহরের দিকে।

বিষয়টি হলো, এই শহরের তিন পাশ পতেঙ্গা ও হালিশহরের দিক দিয়ে সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। আবার হালিশহর, আগ্রাবাদ, ফিরিঙ্গীবাজার, মাদারবাড়ী, নতুন ব্রিজ হয়ে কালুরঘাট পর্যন্ত পুরো এলাকা কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী, এবং এই নদীও সরাসরি বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত। তাহলে যুক্তির বিচারে শহরের পানি জমে থাকার কথা নয়, তা সঙ্গে সাথে কর্ণফুলী নদী হয়ে সাগরে নেমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এখানে পর্যাপ্ত খাল নেই, স্লুইসগেটও নেই; ফলে পানি নামবে কীভাবে? পতেঙ্গা থেকে হালিশহরের দিকে হয়তো সরাসরি খালের মাধ্যমে সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত কিছু স্লুইসগেট থাকতে পারে। আবার পতেঙ্গা থেকে হালিশহর, আগ্রাবাদ, মাদারবাড়ী হয়ে কালুরঘাট পর্যন্ত হয়তো আরও ১০-২০টি স্লুইসগেট থাকা সম্ভব। যদি তা-ই হয়, তাহলে জলাবদ্ধতার এই সংকট থাকার কথা নয়।

এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উপকূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, আধুনিক স্লুইসগেট স্থাপন, নদী ও খালের নিয়মিত খনন, দখলমুক্তকরণ, নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সড়ক, সেতু ও রেলপথ নির্মাণেও পানি প্রবাহের বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনায় আনতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি জনসম্মুখে প্রকাশ, স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, সময়মতো কাজ সম্পন্ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।

উন্নয়ন প্রকল্প কেবল বরাদ্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না; তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাতে হবে। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা ও উপকূলীয় প্লাবন কোনো অনিবার্য নিয়তি নয়। সঠিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক প্রকৌশল, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। প্রতিবছর একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি যেন আমাদের নিয়তি না হয়। সময় এসেছে অস্থায়ী ব্যবস্থার পরিবর্তে স্থায়ী সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার। আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামী দিনের নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে পারে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর