Image description

দিনের আলো শেষ হতেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্জনে চায়ের দোকান ও পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ছে 'মোবাইল জুয়া' নামক এক মরণব্যাধি। সমাজ-সংসার থেকে শুরু করে প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন এই নেশা গেঁথে গেছে। বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষরা রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে পড়ে এই সর্বনাশা আসক্তিতে জড়াচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং নতুন জুয়া প্রতিরোধ আইনের কঠোরতা সত্ত্বেও ডিজিটাল মাধ্যমে ভার্চুয়াল জুয়া এখন মহামারীরূপ ধারণ করেছে।

রাজধানীর অলিগলিতে মোবাইল জুয়ার থাবা এক নীরব মহামারী। ব্যস্ততম মোড় থেকে শুরু করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার চায়ের দোকান, বস্তি বা তরুণদের আড্ডা—সর্বত্রই এখন মোবাইল ফোন যেন একেকটি ভার্চুয়াল ক্যাসিনোতে পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যে কোনো ক্যাসিনো বা জুয়ার বোর্ড না থাকলেও, হাতের স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের কল্যাণে খুব সহজেই জুয়ার জগতে প্রবেশ করছে মানুষ। এর ফলে সর্বস্ব হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বহু পরিবার।

বিদেশে পরিচালিত বেটিং সাইটগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্মার্টফোনে অ্যাপ ডাউনলোড করে অথবা ওয়েবসাইট লিংকে ক্লিক করে 'তিন পাত্তি', রুলেট কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ও ফুটবলের ওপর বাজি ধরা হচ্ছে। মাত্র ১০ বা ৫০ টাকা দিয়ে শুরু করা এই খেলায় প্রলোভন হিসেবে প্রথম দিকে কিছু জয় দেওয়া হয়, যা ব্যবহারকারীকে চরম আসক্তির দিকে ঠেলে দেয়। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বড় অঙ্কের টাকা খুইয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন তারা।

মোবাইল ব্যাংকিং (যেমন—বিকাশ, নগদ, রকেট) এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে টাকা জমা দেওয়া ও তুলে নেওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি এড়াতে জুয়ার মূলহোতারা সাধারণত হুন্ডি বা এজেন্টদের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করে। এর ফলে দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে।

বেকারত্ব, হতাশা এবং সহজে টাকা উপার্জনের লোভকে পুঁজি করে অপরাধ চক্রগুলো তরুণ সমাজকে টার্গেট করছে। রাজধানীর নিম্ন আয়ের শ্রমিক, রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পর্যন্ত এর খপ্পরে পড়ছে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই চুরি, ছিনতাই এবং পারিবারিক সহিংসতার মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

পটুয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. সোহরাব হোসাইনের মতে, "বর্তমান সময়ে সামাজিক অবক্ষয়ের যতগুলো অনুষঙ্গ রয়েছে, তার মধ্যে মারাত্মক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে অনলাইন জুয়া। যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। এর ফলে পারিবারিক সুখ-শান্তি নষ্ট হচ্ছে, মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এই ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি অনলাইন সাইটগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।"

এ বিষয়ে ডিএমপির মতিঝিল জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার হারুন অর রশিদ বলেন, "অনলাইন বা মোবাইলভিত্তিক জুয়া বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রচলিত জুয়া-সংক্রান্ত আইন এবং অনলাইনে পরিচালিত অপরাধের ক্ষেত্রে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পর্কিত আইনও প্রযোজ্য হতে পারে। এছাড়া অবৈধ অর্থ লেনদেন, প্রতারণা বা অর্থপাচারের উপাদান পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।" তিনি অভিভাবকদের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, "সন্তানদের মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহারে নজরদারি রাখুন। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতাই এই অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।"

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া 'জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬'-এ মোট ৪৮টি ধারা রয়েছে। এই নতুন আইনের মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের পুরনো 'দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট' বাতিল করা হয়েছে। আইনটিতে জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা হয়েছে।

এই আইনে সাধারণ জুয়া, অনলাইন বেটিং, সাইবার জুয়ায় ভিপিএন (VPN) বা প্রক্সি ব্যবহার এবং জুয়ার প্রচার-প্রচারণা বা অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিংকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জুয়ার সাইট বা অ্যাপ তৈরি, পরিচালনা এবং প্রচারের দায়ে জড়িতদের সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সচেতন মহল মনে করছে, শুধু সাইট বন্ধ করে বা আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের সন্তানদের মোবাইল ফোনের ব্যবহার এবং তাদের অনলাইন লেনদেনের ওপর নজর রাখা অভিভাবকদের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর