Image description

অবিরাম বর্ষণ, উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢল আর পাহাড়ধস—প্রকৃতির তিন দিকের আঘাতে বিপর্যস্ত দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল। মুহূর্তেই জনপদ পরিণত হয়েছে জলরাশিতে ঘেরা বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। কোথাও পাহাড় ধসে চাপা পড়েছে বসতি, কোথাও স্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি, কোথাও আবার হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে আটকা পড়ে দিন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। জীবন থমকে গেছে, থেমে গেছে স্বাভাবিক ছন্দ।

এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। একই সঙ্গে নদ-নদীর পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় নতুন নতুন এলাকায় বন্যা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ সম্মেলনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।

সাত জেলার ওপর দুর্যোগের সবচেয়ে বড় আঘাত: খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ— এই সাত জেলাই এখন বন্যার প্রধান আঘাতের মুখে। প্লাবিত হয়েছে ৫৯টি উপজেলা, ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা। টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কোথাও সড়ক ডুবে গেছে, কোথাও পাহাড়ধসে বন্ধ হয়ে গেছে যোগাযোগ। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে অসংখ্য গ্রাম। বিদ্যুত্ ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে হাজারো পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে।

প্রাণহানির কেন্দ্র কক্সবাজার: সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এ পর্যন্ত মৃত ৫৪ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে। চট্টগ্রামে প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙ্গামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন। আহত ৩৯ জনের মধ্যে কক্সবাজারে ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে দুজন এবং খাগড়াছড়িতে একজন রয়েছেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখনো ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার পানিবন্দি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১।

নদীর পানি বাড়ছেই, বাড়ছে উত্কণ্ঠাও: পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ২৭ সেন্টিমিটার, মারকুলি পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার এবং সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া সুরমা নদীর কানাইঘাট, সিলেট সদর ও সুনামগঞ্জ, তিস্তার ডালিয়া ও কাউনিয়া এবং মুহুরী নদীর হরিপুর পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার একেবারে কাছাকাছি অবস্থান করছে।

গতকাল সোমবার সকাল ৯টার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দেশের ১২৭টি নদী স্টেশনের মধ্যে ৮০টিতে পানি বেড়েছে। কমেছে ৪৪টিতে। দুটি স্টেশনে পানি অপরিবর্তিত রয়েছে, আর একটি স্টেশনের তথ্য সংগ্রহ চলছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতের মেঘালয়ের মাওকিরওয়াতে ১১৫ মিলিমিটার এবং বাংলাদেশের মধ্যে জামালপুরে সর্বোচ্চ ২০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আগামী দিনগুলোতে নদীর পানি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে দুর্গত মানুষের জন্য সরকার ১ হাজার ৪২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। সেখানে ইতোমধ্যে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ সতর্কতা: বন্যাকবলিত মানুষের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য একটাই—বন্যার কারণে যেন একজন মানুষও চিকিত্সার অভাবে প্রাণ না হারান। তিনি জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ ১১ জেলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা হয়েছে। পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম এবং জরুরি চিকিত্সাসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে অতিরিক্ত মেডিকেল টিম পাঠানো হবে। একটি হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়লে রাতেই চিকিত্সক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে চিকিত্সাসামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন, যাতে চিকিত্সাসেবা ব্যাহত না হয়।

বাড়ছে সাপে কাটা রোগী: স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, বন্যাকবলিত এলাকায় সাপে কাটা ৯৫ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন। সবাই সুস্থ আছেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয়ভাবে এক হাজারের বেশি ভায়াল অ্যান্টিভেনম এবং জেলা পর্যায়ে ২১ হাজার ভায়াল মজুত রয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও ২৫ হাজার ভায়াল যুক্ত হবে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ মোকাবিলায় ওআরএস, স্যালাইন, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং বিশেষ মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার: বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ৭ জুলাই থেকে পর্যায়ক্রমে ত্রাণ বরাদ্দ দিয়ে আসছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার জন্য মোট ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে চট্টগ্রাম— ৬৫ লাখ টাকা ও ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল। কক্সবাজার পেয়েছে ৩০ লাখ টাকা ও ৪৫০ টন চাল, রাঙ্গামাটি ২৫ লাখ টাকা ও ৫০০ টন, খাগড়াছড়ি ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ টন, বান্দরবান ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ টন, মৌলভীবাজার ১০ লাখ টাকা ও ২০০ টন এবং হবিগঞ্জ ৫ লাখ টাকা ও ১০০ টন চাল। অন্যদিকে দেশের বাকি ৫৭ জেলার প্রতিটির জন্য ৫ লাখ টাকা ও ১০০ মেট্রিক টন করে চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে দুর্গত মানুষের মধ্যে এসব সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে।

সামনে কঠিন সময়ের শঙ্কা: আবহাওয়া ও নদ-নদীর বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, বিপদ এখনো কাটেনি। উজান ও দেশের অভ্যন্তরে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম বিভাগের আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদারের পাশাপাশি সরকার জনগণকে নিরাপদ স্থানে অবস্থান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলা এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ প্রকৃতির এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় লড়াই এখন জীবন বাঁচানোর।