Image description

দেশের ব্যাংক খাত ভালো না থাকলেও কাগজে-কলমে ভালো দেখিয়ে আসা হয়েছে। এটা অসম প্রতিযোগিতা। এটা করা হয়েছে সরকারের সহযোগিতায়। এই প্রতিযোগিতার শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। ব্যাংক খাতকে এই অবস্থান থেকে বাঁচাতে ব্যাংকের সংখ্যা কমাতে হবে বলে পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও বিভিন্ন মূল্যায়নে বর্তমানে দেশের ১০টি ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও খারাপ অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন মাত্রার আর্থিক সংকটে বা মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে এমন দুর্বল ব্যাংকের সংখ্যা ৩৮টি পর্যন্ত বলে বিভিন্ন গোপন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটা হয়েছে দেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়ায়। সম্প্রতি দেউলিয়ার পথে থাকা পাঁচটি ব্যাংক এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ করা হয়েছে। দেউলিয়ার হাত থেকে বাঁচাতে সরকার ব্যাংকগুলোতে একীভূত করেছে, বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকিং পরিভাষায় যখন কোনো ব্যাংক তাদের নিজস্ব মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ন্যূনতম সীমার নিচে নামে সেটাকে মূলধন ঘাটতি বলে। এই খাতের সার্বিক মূলধন ঘাটতি আড়াই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঋণ কেলেঙ্কারি ও রাজনৈতিক প্রভাবে বছরের পর বছর ধরে বিতরণ করা বড় অঙ্কের ঋণ আদায় না হওয়ায় মন্দ ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পূর্বে শক্তিশালী অবস্থানে থাকা বেশ কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে গিয়ে সবচেয়ে বড় মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। প্রয়োজনীয় মূলধন ছাড়াই বছরের পর বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা সামগ্রিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মূলধন ঘাটতি থাকলেও কাগজে-কলমে তা স্বাভাবিক দেখানো হয়েছে। আর এটা হয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবে। 

ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এই সুযোগকে অর্থ পাচারসহ নানা অনিয়ম করছেন। ট্রেড-বেইজড মানি লন্ডারিং বর্তমানে অবৈধ অর্থ বিদেশে পাচারের অন্যতম বড় মাধ্যম। বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা না বাড়িয়ে দেশে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ায় অনেক অনিয়ম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে দেশ থেকে অর্থপাচার হচ্ছে অনেকটা বাধাহীনভাবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ব্যাংক দেউলিয়া হলে আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে হেয়ার কাট নামে যে বিধান হয়েছে কার্যকর হবে না। সুদসহ পুরো টাকা ফেরত পাবেন আমানতকারীরা। তবে এজন্য ধৈর্য ধারণ করতে হবে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হলে তার আমানতকারীরা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা ফেরত পাবেন।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সেলিম জাহান বলেন, অনাদায়ী ঋণে জর্জরিত ব্যাংক খাত। খেলাপি ঋণের পাহাড়। অনেক ব্যাংকে বর্তমানে নীতি সহায়তা ও অর্থের যোগান দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। শিল্প খাতে আমরা দেখি যখন, একটি কোম্পানি লোকসানে চলে যায় একটা সময় তা বন্ধ করে দেয়া হয়। সরকারি বিভিন্ন কোম্পানি বন্ধ করে দিয়েছে। তেমন এসব মৃত ব্যাংক বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই। বন্ধ করে দেয়া এখন সময়ের দাবি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এসব ব্যাংক বন্ধ করে দিলে অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হবে। সেটা হয় তো সাময়িক। কাগজে-কলমে দীর্ঘদিন থেকে ব্যাংকগুলোতে মুনাফার রেকর্ড দেখিয়ে আসা হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক রেকর্ড মুনাফা করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫৭ শতাংশ বেশি। সিটি ব্যাংক ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকও ৯০০ কোটির বেশি মুনাফা অর্জন করেছে। এছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়ার মতো ব্যাংকগুলোর মুনাফাতেও বড় প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।

ব্যাংক সাংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থনীতি খারাপ হলেও কাগজে আয় দেখানো সম্ভব হয়েছে। ব্যাংক খাতের বর্তমান মুনাফা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, এই মুনাফার বড় অংশ বাস্তব ব্যবসায়িক সমপ্রসারণ বা ঋণ আদায়ের সফলতা থেকে আসেনি; বরং এসেছে হিসাব ব্যবস্থার সুবিধা, সরকারি ঋণনির্ভর আয় এবং প্রভিশন কম রাখার সুযোগ থেকে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম দেখানো গেছে, সেসব ব্যাংকের মুনাফা তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে কম সঞ্চিতি রাখতে হওয়ায় নিট মুনাফা বেড়েছে। অনেক ব্যাংক ট্রেজারি ব্যবসা এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠান থেকেও বড় আয় করেছে। ফলে মূল ব্যাংকিং কার্যক্রম দুর্বল হলেও কাগজে মুনাফা বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই ঋণের পরিমাণও কমিয়ে দেখা হয়েছে ছিলো। 

৮ জুলাই বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগজনক হারে খেলাপি ঋণ বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে জোরপূর্বক ঋণ। বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানিভিত্তিক বাণিজ্য অর্থায়নে নন-ফান্ডেড দায় ফোর্সড লোনে রূপ নেয়ায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মানের অবনতি হচ্ছে এবং ঋণঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। যেসব ব্যাংকের বাণিজ্য অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে, সেসব ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্স পোর্টফোলিওতে সম্পদের গুণগত মানের ওপর ইতোমধ্যে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এসব ব্যাংকে বাণিজ্য অর্থায়ন-সংক্রান্ত খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। গবেষণায় রপ্তানি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। ব্যাংকারদের মতে, আইনগতভাবে বৈধ ও কার্যকর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়া ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার কারণে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে রপ্তানি আয় সময়মতো দেশে না এলে সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন দ্রুত ফোর্সড লোনে পরিণত হচ্ছে।

অনেক আগে থেকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলে আসছে বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বৃদ্ধি না করে ব্যাংকের সংখ্যা বাড়ানো হবে আত্মঘাতী। ব্যাংক খাতের বর্তমান চিত্র বলে দিচ্ছে আইএমএফের সেই সতর্কবার্তা ঠিক ছিলো। আইএমএফ গত জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে অনিরাপদ তারল্য দেয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে। এর পাশাপাশি বিনিময় হার সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন করারও আহ্বান জানায়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদের মান পর্যালোচনা পরিচালনা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এগিয়ে নেয়া এবং সুশাসন ও ব্যালান্স শিটের স্বচ্ছতা জোরালো করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠন ও মূল্যস্ফীতি কমাতে কঠোর নীতির সমন্বয় বজায় রাখা প্রয়োজন।